প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক স্থলবন্দর। রয়েছে শেড, ওয়্যারহাউস, ট্রাক পার্কিং ইয়ার্ড, প্রশাসনিক ভবন ও ডরমিটরি। কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও চালু হয়নি বন্দরটি। ব্যবহারের বদলে বন্দরের চত্বরে এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে গবাদিপশু। ভবনের দরজা-জানালায় ধরেছে মরিচা, বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে ক্ষয়; জমেছে ময়লা-আবর্জনা।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার কেদারাকোট এলাকায় নির্মিত বাল্লা স্থলবন্দরের এমন চিত্র সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমান্তের ওপারে ভারতের ত্রিপুরা অংশে প্রয়োজনীয় কাস্টমস অবকাঠামো ও সড়ক যোগাযোগ গড়ে না ওঠায় বাংলাদেশের অংশ প্রস্তুত থাকলেও বন্দরটি চালু করা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বন্দর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৪৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর আগে প্রায় ১৩ একর জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয় আরও প্রায় ৭ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে বাল্লাকে স্থলবন্দর ঘোষণা করে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ। পরের বছর ১ জুলাই প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় একনেক। ২০২৩ সালের জুনে নির্মাণকাজ শেষ হয়। তবে এরপরও বন্দরটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়নি।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ছিল, বন্দরটি চালু হলে ভারতের ত্রিপুরাসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের নতুন দ্বার খুলবে। কৃষিপণ্য, মাছ, সিরামিক, স্যানিটারি পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও নির্মাণসামগ্রী রপ্তানির পাশাপাশি ভারত থেকে পেঁয়াজ, আদা, রসুন ও ফল আমদানির সুযোগ তৈরি হবে।
চুনারুঘাট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সদস্য সচিব সাজিদুর রহমান বলেন, বন্দরটি চালু হলে ত্রিপুরাসহ ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বিভিন্ন পণ্য সহজে রপ্তানি করা সম্ভব হতো। এতে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও সম্প্রসারিত হতো।
স্থানীয় ব্যবসায়ী জালাল মিয়া বলেন, বন্দর চালু হলে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ার পাশাপাশি বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে—এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বর্তমানে খোয়াই নদী পার হয়ে ঝুঁকি নিয়ে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে। এত টাকা ব্যয়ে নির্মিত বন্দর যদি ব্যবহারই না হয়, তাহলে এই বিনিয়োগের সুফল কোথায়—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
নতুন স্থলবন্দর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে বাল্লায় রয়েছে পুরোনো কাস্টমস স্টেশন। ব্রিটিশ আমল থেকে চালু থাকা ওই স্টেশন দিয়ে খোয়াই নদীপথে সীমিত পরিসরে অনিয়মিত আমদানি-রপ্তানি হয়ে আসছে। একই পথ বাংলাদেশ ও ভারতের পাসপোর্টধারী যাত্রীদের চলাচলেও ব্যবহৃত হয়।
তবে খোয়াই নদীর কারণে এ পথে বাণিজ্য পরিচালনা দীর্ঘদিন ধরেই দুরূহ। বর্ষায় নৌকায় করে পণ্য পরিবহন করতে হয়। আর শুষ্ক মৌসুমে শ্রমিকদের মাথায় করে নদী পার করতে হয় পণ্য।
এই দুর্ভোগের অবসান এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কেদারাকোট এলাকায় আধুনিক স্থলবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০১২ সালের ১১ জুন বাংলাদেশ ও ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রতিনিধি দল কেদারাকোট এলাকা পরিদর্শন করে। পরে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও কয়েক দফা এলাকা পরিদর্শন করেন। এর চার বছর পর বাল্লাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্থলবন্দর ঘোষণা করা হয়।
বন্দর নির্মাণের জন্য প্রায় ১৩ একর জমি অধিগ্রহণের ফলে শতাধিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। তাদের মধ্যে ১৭টি পরিবার এখনও বন্দরের ভেতরে বসবাস করছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের অভিযোগ, জমি অধিগ্রহণ করা হলেও অনেকে এখনও যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাননি। জমি অধিগ্রহণের পর বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ক্ষতিপূরণের আশায় অনেক পরিবার সেগুলো সংস্কার করতে পারেনি। ফলে কেউ কেউ ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করছেন।
তাদের দাবি, দ্রুত জমি ও বসতঘরের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান করা হোক।
এ বিষয়ে বাল্লা স্থলবন্দরের সুপারিনটেনডেন্ট সবুজ চন্দ্র রায় বলেন, অনেকের জমির কাগজপত্রে জটিলতা থাকায় ক্ষতিপূরণের অর্থ দেওয়া সম্ভব হয়নি। যাদের কাগজপত্রে সমস্যা রয়েছে, তারা তা সংশোধন করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করলে পাওনা বুঝে পাবেন।
বন্দরটি চালু না হলেও এর অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে জনবল রয়েছে। বর্তমানে পাঁচজন নিরাপত্তাকর্মী ও দুইজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান সুপারিনটেনডেন্ট সবুজ চন্দ্র রায়।
তিনি বলেন, বন্দরের চত্বর রক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এসব জনবল দায়িত্ব পালন করছেন। তবে বন্দরটি কবে নাগাদ চালু হতে পারে, তা এখনই বলা কঠিন।
গাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, বাংলাদেশের অংশে বন্দর চালুর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত রয়েছে। এখন প্রয়োজন কূটনৈতিক উদ্যোগ। ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে ওপারের অংশ চালু করা গেলে এ অঞ্চলসহ দেশের অর্থনীতিও লাভবান হবে।
তবে এ প্রকল্প নিয়ে রাজনৈতিক সমালোচনাও রয়েছে। চুনারুঘাট উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মীর সিরাজের অভিযোগ, ভারতের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমঝোতা বা সুনির্দিষ্ট চুক্তি ছাড়াই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তার দাবি, কার্যকর পরিকল্পনা ছাড়া বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত স্থলবন্দরটি এখন অচল অবকাঠামোয় পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে দুর্নীতিবিরোধী স্থানীয় নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘হবিগঞ্জ ক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলন’-এর সমন্বয়ক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, সরকারি অর্থের এমন বিনিয়োগের সুফল নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকল্পের পরিকল্পনা, অনুমোদন ও বাস্তবায়নে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
বাল্লা স্থলবন্দর চালুর বিষয়ে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মনজুরুল মান্নান বলেন, অদূর ভবিষ্যতে এই স্থলবন্দর চালু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে কর্তৃপক্ষ মূলত পাহারাদারের ভূমিকা পালন করছে।
তিনি বলেন, সীমান্তের উভয় পাশে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বন্দরটি চালুর সুযোগ নেই।
ফলে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাল্লা স্থলবন্দর পড়ে আছে ব্যবহারহীন। যে স্থাপনাকে ঘিরে সীমান্ত বাণিজ্য সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আনার স্বপ্ন দেখেছিলেন ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা, সেটিই এখন পরিণত হয়েছে নীরব অবকাঠামোয়। সীমান্তের ওপারে অবকাঠামো নিশ্চিত হওয়ার আগে এত বড় বিনিয়োগ কেন করা হলো, এ প্রশ্নের উত্তরও এখন খুঁজছেন স্থানীয়রা।
আরও পড়ুন:







