মঙ্গলবার

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৬ আশ্বিন, ১৪৩৩

মাদক রুখবে যারা, অভিযানের নামে তারাই করছে ব্যবসা?

বিবি মরিয়ম চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৩১

আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৩২

শেয়ার

মাদক রুখবে যারা, অভিযানের নামে তারাই করছে ব্যবসা?
ছবি সংগৃহীত

চট্টগ্রামে ডিবি পুলিশের ৪ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার। এজাহারে পুলিশের বর্ণনাটাও খুব স্পষ্ট। কিন্তু সেই বর্ণনার আড়ালেই যেন তৈরি হচ্ছে একের পর এক প্রশ্ন, ঘনীভূত হচ্ছে ধোঁয়াশার কালো মেঘ। এজাহারে ইয়াবা উদ্ধারের যে বর্ণনা, তার বিপরীতে বাংলা এডিশনের হাতে আসা তথ্য ও চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। আর সেই ভিন্নতার সূত্র ধরেই অনুসন্ধানে নামে টিম বাংলা এডিশন। এতে, উঠে আসে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।

এজাহারে পুলিশের বর্ণনা

গত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর)। জানা যায়, চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানায় একটি মাদক মামলা করে ডিবি উত্তর। মামলার সেই এজাহারে বলা হয়, ভোর ৩টা ৫০ মিনিটে চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গী বাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কে অস্থায়ী চেকপোস্টে একটি যাত্রীবিহীন মিনিবাসকে থামালে চালক জানালা দিয়ে পালিয়ে যান। পরে চালকের আসনের নিচে একটি কালো শপিং ব্যাগ থেকে উদ্ধার করা হয় ৪ হাজার পিস ইয়াবা।

সিসিটিভি ফুটেজে ভিন্ন বাস্তবতা

কিন্তু বিপত্তি বাধে এখানেই। বাংলা এডিশনের হাতে আসা তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। পটিয়ার দুটি পেট্রোল পাম্পের সিসিটিভি ফুটেজ থেকে জানা যায়, ভোর ৩টা ৫০ মিনিটে চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গী বাজারে কথিত মিনিবাসটি আটক করা হয়নি; বরং রাত ১২টা ৬ মিনিটে চট্টগ্রাম শহরের বাইরে পটিয়া ক্রসিং এলাকার আমিন উল্লাহ ট্রেডিং কর্পোরেশন ফিলিং স্টেশনে মিনিবাসটি জব্দ করা হয়েছে।

সূত্র বলছে, গত শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টা ৫৮ মিনিটে শাহ আমানত ফিলিং স্টেশনের সামনে দিয়ে মিনিবাসটি গেলে এর পেছনে ডিবির ব্যবহৃত গাড়ি এবং তাদের সোর্স পলাশের কালো মাইক্রোবাসকেও পিছু নিতে দেখা যায়। এরপর রাত ১২টা ৬ মিনিটে পটিয়া ক্রসিং এলাকার আমিন উল্লাহ ট্রেডিং কর্পোরেশন ফিলিং স্টেশনে মিনিবাসটি ঢুকলে কালো ও ধূসর রঙের দুটি মাইক্রোবাস এবং বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল পরপর সেখানে হাজির হয় বলে উঠে আসে সিসিটিভি ফুটেজ থেকে।

এমনকি মিনিবাসটির আশপাশে প্রায় ১৮ থেকে ১৯ জন মানুষ জড়ো হয়ে তা তল্লাশি শুরু করে। তল্লাশির একপর্যায়ে রাত আনুমানিক সাড়ে বারোটার দিকে একজন ব্যক্তিকে মিনিবাস থেকে একটি বস্তু বের করে সোর্সের কালো মাইক্রোবাসে রেখে দিতেও দেখা যায় সিসিটিভি ফুটেজে।

এছাড়াও, আমিন উল্লাহ ট্রেডিং কর্পোরেশন ফিলিং স্টেশনের এক কর্মচারীর বক্তব্য থেকেও উঠে আসে ঘটনার এই চিত্র।

ডিবি গাড়িচালক ও তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য

এদিকে, অভিযানে অংশ নেয়া ডিবির গাড়ি চালকের বক্তব্য থেকেও পাওয়া যায়, তথ্যের ভিন্নতার ছাপ।

সেইসঙ্গে তার বক্তব্যে উঠে আসে এমন কিছু মন্তব্য, যা সরাসরি প্রশ্নের মুখে ফেলে ডিবির ভূমিকা। ডিবি গাড়িচালকের দাবি, শহর থেকে দূরে একটি পেট্রোল পাম্পে মিনিবাসটি আটক করে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। পরে, ডিবির কর্মকর্তারা অন্য একজন চালকের সহযোগিতায় মিনিবাসটি শহরে নিয়ে আসে।

কিন্তু পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য—চেকপোস্ট বসানোর আগে ডিবির কোনো টিম শহরের বাইরে যায়নি। সেই সঙ্গে বাংলা এডিশনের অনুসন্ধানে হাতে আসা পটিয়ার পেট্রোল পাম্পের ফুটেজে ডিবির ব্যবহৃত গাড়ির উপস্থিতি দেখানো হলেও তিনি দাবি করেন, পাম্পে মিনিবাস থেকে কোনো ইয়াবা উদ্ধার হয়নি।

টোল ডাটায় সময়ের ফাঁক

মিনিবাস আটকের বিষয়ে পুলিশের দেয়া এজাহারের সঙ্গে, আমিন উল্লাহ ট্রেডিং কর্পোরেশন ফিলিং স্টেশন থেকে উঠে আসা ভিন্ন বাস্তবতার মধ্যেই, বাংলা এডিশনের হাতে আসে আরও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য।

ডিবির দেয়া এজাহারে কথিত আটক দেখানো হয়েছে ভোর ৩টা ৫০ মিনিটে। অথচ টোল ডাটা বলছে, রাত ১২টা ৫৩ মিনিটেই মিনিবাসটি শহরে ঢুকেছে। ঠিক তার পরপরই ১২টা ৫৭ মিনিটে একই টোল প্লাজা অতিক্রম করে ডিবির ব্যবহৃত সিএমপি-১৩১ নম্বর গাড়ি।

কিন্তু, প্রশ্নের তীক্ষ্ণ তীর যেন এখানেই। টোল প্লাজা থেকে কথিত আটকের স্থানে পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র ১০ মিনিট। কিন্তু, এর মাঝেই চলে যায় প্রায় তিন ঘণ্টা। তাহলে আটকের আগে এই দীর্ঘ সময়ে মিনিবাসটি কোথায় ছিল? কার নিয়ন্ত্রণে ছিল? আর কী ঘটেছিল সেই সময়টুকুতে? সেটিই এখন অনুসন্ধানের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যে প্রশ্নের কোনো ব্যাখ্যা নেই এজাহারে।

চালকের পালানো ও অন্যান্য সন্দেহ

শুধু তাই নয়, এজাহারে চালকের পালানোর বিষয় নিয়ে ডিবির দেয়া বর্ণনাতেও তৈরি হয়েছে নানা সংশয়। ডিবির দাবি, চালক জানালা দিয়ে পালিয়েছেন। কিন্তু চালকের সিটের পাশেই ছিল বের হওয়ার দরজা। স্বাভাবিক প্রশ্ন দাঁড়ায়—দরজা থাকতে জানালা কেন?

এই প্রশ্নের মাঝেই উঠে আসে আরও কিছু কঠিন বাস্তবতা। একাধিক গোপন সূত্রে জানা যায়, পটিয়া বাইপাস এলাকা থেকে প্রায় ২ লাখ পিস ইয়াবাসহ মিনিবাসটি আটক করে চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরবর্তীতে, সংশ্লিষ্ট পাম্প আমিন উল্লাহ ট্রেডিং কর্পোরেশন ফিলিং স্টেশনে রফাদফা শেষে চালককে ছেড়ে দেয়া হয় বলে সূত্রের দাবি।

এদিকে, সংশ্লিষ্ট পাম্পের অপর এক কর্মচারীও তুলে ধরেন ঘটনার অন্য আরেক চিত্র। তিনি জানান, শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত ৯টার দিকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে দুই ব্যক্তি পেট্রোল পাম্পে এসে সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে যায়।

এতে করে সন্দেহের তীর আরও ঘনীভূত হয়। ঘটনা যদি পুলিশের দাবি অনুযায়ীই সত্য হয়ে থাকে এবং স্বচ্ছ অভিযানই যদি পরিচালনা করা হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তীতে এসে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ কেন? এর কারণ নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা সংশয়।

মিনিবাসের মালিকানা ও সাক্ষীদের পরিচয়

আটককৃত ঢাকা মেট্রো-ঝ-১১-০৩১১ নম্বরের মিনিবাসটির বর্তমান মালিক হিসেবে নারায়ণগঞ্জের নুরুল আবছারের নামের একজনকে পাওয়া যায়। টোলের ডাটা বলছে, গত চার মাসে মিনিবাসটি মেঘনা, গোমতী ও কর্ণফুলী সেতু অতিক্রম করেছে প্রায় ৩১ বার। সূত্রের দাবি, বাসটি দীর্ঘদিন ধরেই ইয়াবা পাচারে ব্যবহৃত হচ্ছিল।

অন্যদিকে, অভিযানের পরপরই জসিম নামের একজন পাম্পের পাশের এক দোকানদারের কাছে নিজেকে বাস মালিক পরিচয় দিয়ে মিনিবাসটির সন্ধান চেয়েছিলেন বলেও জানা যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই দোকানদারের কাছ থেকে পাওয়া যায় জসিমের মোবাইল নম্বর। পরে, কল দেয়া হলে বন্ধ পাওয়া যায় সেটি।

সেই সঙ্গে নম্বরটি টেকনাফ উপজেলার লেদা পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা জালাল আহমদের নামে নিবন্ধিত বলেও তথ্য রয়েছে। তবে জালাল আহমদের সঙ্গে মিনিবাসটির মালিক নুরুল আবছারের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—তা এখনো ধোঁয়াশাময়।

শুধু ডিবির বক্তব্যই নয়, এবার আঙুল উঠেছে এজাহারে থাকা সাক্ষীদের নিয়েও। সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা দুই ব্যক্তির মোবাইল নম্বর অনুসন্ধান করে তাদের নামের সঙ্গে পাওয়া যায়নি কোনো মিল। এমনকি স্থানীয় অসংখ্য মানুষের সঙ্গে কথা বলেও মেলেনি সংশ্লিষ্ট দুই সাক্ষীর পরিচয়। ফলে এজাহারে থাকা দুই সাক্ষীর অস্তিত্ব ও পরিচয় ঘিরেও তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।

এজাহারে বলা হয়েছে, ভোর ৩টা ৫০ মিনিটে এই এলাকায় মিনিবাসটি আটক করা হয়। কিন্তু টোল প্লাজার তথ্য অনুযায়ী, এর প্রায় তিন ঘণ্টা আগে রাত ১২টা ৫৩ মিনিটে মিনিবাসটি শহরে প্রবেশ করেছিল। এই সময়ের মধ্যে গাড়িটি কোথায় ছিল? কী ঘটেছিল? কার নিয়ন্ত্রণেই বা ছিল? এই প্রশ্নগুলোই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে পুরো ঘটনাকে ঘিরে।

তবে সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে কোথায়? এজাহারের পাতায় অথবা সিসিটিভির নীরব চোখে। রাতের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া সেই প্রায় তিন ঘণ্টার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্য।