সোমবার

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৬ আশ্বিন, ১৪৩৩

চট্টগ্রাম বিভাগের ১২ কারাগারে ধারণক্ষমতার আড়াই গুণ বন্দি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:৩৮

আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:৪২

শেয়ার

চট্টগ্রাম বিভাগের ১২ কারাগারে ধারণক্ষমতার আড়াই গুণ বন্দি
ছবি সংগৃহীত

চট্টগ্রাম বিভাগের ১২টি কারাগারে ধারণক্ষমতার তুলনায় আড়াই গুণের কাছাকাছি বন্দি থাকায় চাপ বেড়েছে কারা কর্তৃপক্ষের ওপর। সাত হাজার ৮৫০ জনের ধারণক্ষমতার এসব কারাগারে বর্তমানে বন্দি রয়েছেন ১৯ হাজার ৯৬৬ জন। অতিরিক্ত বন্দির কারণে কারাবিধি অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণি ও মামলার বন্দিদের পৃথক রাখার ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে।

কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের ১২টি কারাগারে পুরুষ বন্দির ধারণক্ষমতা সাত হাজার ৪৭৯ জন এবং নারী বন্দির ধারণক্ষমতা ৪১৩ জন। বর্তমানে পুরুষ বন্দি রয়েছেন ১৯ হাজার ২২২ জন এবং নারী বন্দি ৭৪৪ জন।

এসব কারাগারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন এক হাজার ১৩১ জন। এর মধ্যে পুরুষ এক হাজার ৬৮ জন ও নারী ৬৩ জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ২৫৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২৪০ জন ও নারী ১৭ জন। মাদক মামলায় আটক বন্দির সংখ্যা চার হাজার ২৬৮ জন।

কারা কর্মকর্তারা জানান, কারাগারে বিভিন্ন শ্রেণি ও অপরাধের বন্দিদের পৃথক রাখার বিধান রয়েছে। তবে ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বন্দি থাকায় বাস্তবে এ ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে বিভিন্ন মামলায় ও অপরাধে আটক বন্দিদের অনেক ক্ষেত্রেই একই সঙ্গে রাখতে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে সবচেয়ে বেশি চাপ

দুই হাজার ২৪৯ জনের ধারণক্ষমতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বর্তমানে বন্দি রয়েছেন ছয় হাজার ৯০৩ জন। এর মধ্যে মাদক মামলার আসামি ৯০৯ জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ২২৬ জন, যার মধ্যে নারী ১৬ জন।

এ কারাগারে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ৪৯৫ জন পুরুষ ও ২২ জন নারী। পুরুষ হাজতি পাঁচ হাজার ৪৯১ জন এবং নারী হাজতি ১৬৯ জন। পুরুষ কয়েদি ৪৯৫ জন ও নারী কয়েদি ২৩ জন। বিদেশি বন্দি রয়েছেন ৭৬ জন।

এক হাজার ৭৪২ জনের ধারণক্ষমতার কুমিল্লা কারাগারে বন্দি রয়েছেন তিন হাজার ১৮০ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি দুই হাজার ১২৭ জন ও নারী হাজতি ১০৬ জন। পুরুষ কয়েদি ৭১৩ জন এবং নারী কয়েদি ১৬ জন।

কুমিল্লা কারাগারে তিনজন পুরুষ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ১৯৮ জন পুরুষ ও ১৫ জন নারী। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ৮৩৩ জন।

৮৩০ জনের ধারণক্ষমতার কক্সবাজার কারাগারে বন্দি রয়েছেন দুই হাজার ৮৮৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি দুই হাজার ৭৪১ জন ও নারী হাজতি ১৪৪ জন। পুরুষ কয়েদি ২৮৪ জন এবং নারী কয়েদি সাত জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন চার জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ১৬২ জন পুরুষ ও চার জন নারী। মাদক মামলায় আটক বন্দি ৮৮৪ জন।

৭৮০ জনের ধারণক্ষমতার ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে বন্দি রয়েছেন দুই হাজার ১৯১ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি এক হাজার ৫১৫ জন ও নারী হাজতি ৩১ জন। পুরুষ কয়েদি ৫৩১ জন এবং নারী কয়েদি ৫৬ জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন দুই জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ৩৮ জন পুরুষ ও পাঁচ জন নারী। মাদক মামলার আসামি ৬৮০ জন। বিদেশি বন্দি রয়েছেন একজন।

অন্যান্য কারাগারেও ধারণক্ষমতার বেশি বন্দি

৫০০ জনের ধারণক্ষমতার নোয়াখালী কারাগারে বর্তমানে বন্দি রয়েছেন এক হাজার ৯০ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ৮৬৪ জন ও নারী হাজতি ২৯ জন। পুরুষ কয়েদি ১২৯ জন এবং নারী কয়েদি পাঁচ জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ছয় জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ৫৫ জন পুরুষ ও দুই জন নারী। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ২০১ জন।

৪৭৫ জনের ধারণক্ষমতার চাঁদপুর কারাগারে বন্দি রয়েছেন এক হাজার ৮৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ৮০১ জন ও নারী হাজতি ২৮ জন। পুরুষ কয়েদি ২০৭ জন এবং নারী কয়েদি চার জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন একজন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ৪০ জন পুরুষ ও চার জন নারী। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ৪৪৬ জন।

৫৬৪ জনের ধারণক্ষমতার ফেনী-১ কারাগারে বন্দি রয়েছেন ৫২৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ৩৯৫ জন ও নারী হাজতি ১৮ জন। পুরুষ কয়েদি ৫৯ জন এবং নারী কয়েদি চার জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ১২ জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ২৮ জন পুরুষ ও তিন জন নারী। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ১৩ জন। বিদেশি বন্দি রয়েছেন তিন জন।

৭২ জনের ধারণক্ষমতার ফেনী-২ কারাগারে বন্দি রয়েছেন ৪৬৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ১৭০ জন এবং পুরুষ কয়েদি ২৮১ জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ১২ জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ১৩ জন পুরুষ।

২৯৫ জনের ধারণক্ষমতার লক্ষ্মীপুর কারাগারে বন্দি রয়েছেন ৬৬৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ৪৪৯ জন ও নারী হাজতি নয় জন। পুরুষ কয়েদি ১৫৩ জন এবং নারী কয়েদি চার জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন দুই জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ৪৬ জন পুরুষ। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ৬৩ জন।

১৪৮ জনের ধারণক্ষমতার রাঙামাটি কারাগারে বন্দি রয়েছেন ২৬৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ২১১ জন ও নারী হাজতি পাঁচ জন। পুরুষ কয়েদি ৪৬ জন এবং নারী কয়েদি দুই জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন পাঁচ জন পুরুষ। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ১০৮ জন। বিদেশি বন্দি রয়েছেন দুই জন।

১১৪ জনের ধারণক্ষমতার বান্দরবান কারাগারে বন্দি রয়েছেন ৪৪১ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ৩৪৬ জন ও নারী হাজতি আট জন। পুরুষ কয়েদি ৬২ জন এবং নারী কয়েদি তিন জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ১৮ জন পুরুষ ও একজন নারী। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ৮৪ জন। বিদেশি বন্দি রয়েছেন ৪৫ জন।

৮১ জনের ধারণক্ষমতার খাগড়াছড়ি কারাগারে বন্দি রয়েছেন ২৬৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ২১৮ জন ও নারী হাজতি দুই জন। পুরুষ কয়েদি ৪৪ জন এবং নারী কয়েদি একজন। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ২১ জন।

৩৬ বর্গফুটের জায়গায় রাখা হচ্ছে দুই-তিন জন

কারাগার সূত্র জানিয়েছে, জেল কোড অনুযায়ী প্রত্যেক বন্দির জন্য ৩৬ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার কথা। কিন্তু চট্টগ্রামের ১১টি কারাগারে বন্দির সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ায় এই সুবিধা দেওয়া যাচ্ছে না। একজনের জন্য নির্ধারিত জায়গায় দুই থেকে তিন জন করে রাখতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, কারাগার শুধু শাস্তি দেওয়ার স্থান নয়, এটি সংশোধনাগারও। বন্দিদের মানবিক জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারাবিধি অনুযায়ী একজন বন্দি যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকারী, তা তাকে দিতে হবে।

তিনি বলেন, কারাগারে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তি অপরাধী এমনটি মনে করার সুযোগ নেই। অনেকেই মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলায় কারাগারে রয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে এমন মামলায় আটক ব্যক্তিদের আদালত থেকে খালাস পাওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে। তাই বিচারাধীন বন্দিদের মানবিক মর্যাদা ও কারাবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী আরও বলেন, আধুনিক সমাজে কারাগারগুলো সংশোধনাগার হওয়ার পরিবর্তে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে বলে তিনি শুনছেন। অনেক মামলার আসামির জামিননামা কারাগারে পৌঁছানোর পরও তাদের মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। নতুন মামলা দেওয়ার কথা বলে কিংবা থানা-পুলিশকে খবর দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে নতুন মামলা দেওয়ার আয়োজন করা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।

নতুন কারাগারের প্রস্তাব দিয়েছে কর্তৃপক্ষ

চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন) মো. ছগির মিয়া জানান, অতিরিক্ত বন্দির কারণে কারাগারের কর্মকর্তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিভাগের ১২টি কারাগারে বর্তমানে বন্দির সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দি রয়েছে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ কয়েকটি কারাগারে বন্দির সংখ্যা কিছুটা বেশি। চট্টগ্রামে নতুন একটি কারাগারের জন্য প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। বন্দিদের যত্নে কোনো প্রকার সমস্যা হচ্ছে না। তবে বেশি বন্দির কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।