আজমুল যে মেসে থাকতেন, সেটি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনে ইসলামনগর রোডে অবস্থিত একটি চারতলা ভবন। ভবনটির পুরো অংশ ছাত্রমেস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী থাকেন। চারতলার ডি-৮ নম্বর কক্ষে থাকতেন আজমুল। পাশের ডি-২ নম্বর কক্ষে থাকতেন গোপালগঞ্জ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এবং মেসের ম্যানেজার মেহেদী।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার রাতে মেসের ম্যানেজার মেহেদীর ভাত আজমুল খেয়ে ফেলেছেন—এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করে তাকে মারধর করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, মেহেদীসহ মেসের কয়েকজন শিক্ষার্থী ও বহিরাগত ব্যক্তি আজমুলকে ছাদে নিয়ে মারধর করেন।
মেসের বুয়া ফাতেমা বলেন, ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে কয়েকজন আজমুলকে মারধর করেন। তিনি তাদের বাধা দিলেও তারা তার কথা শোনেননি। পরে তিনি জানতে পারেন, আজমুল মারা গেছেন।
মেসের পেছনের ভবনের এক বাসিন্দা জানান, রাত আনুমানিক ১টার দিকে তিনি একটি বিকট শব্দ শুনতে পান। পরে বাড়ির সামনের গলিতে এক যুবককে পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর মেসের কয়েকজন শিক্ষার্থী অ্যাম্বুলেন্স এনে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
পরে আজমুলকে উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্সে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া মেসের শিক্ষার্থীরা দ্রুত সেখান থেকে চলে যান।
খুমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একজন চিকিৎসক জানান, আজমুলের সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তার দুই পা ভাঙা ছিল বলেও জানান তিনি।
নিহতের বাবা মো. কুতুব উদ্দিন বলেন, রাত ৯টার দিকে ছেলে তাকে ফোন করে জানায়, সে ভালো আছে এবং তাকে নিয়ে চিন্তা না করতে। কিন্তু রাত ১২টার পর আজমুলের মোবাইল ফোন থেকেই অন্য একজন তাকে ফোন করেন।
কুতুব উদ্দিনের ভাষ্য, ওই ব্যক্তি ফোনে বলেন, ‘আপনার ছেলে ঝামেলা করেছে। তাকে পেতে হলে দ্রুত ১ লাখ টাকা নিয়ে আসেন। টাকা না আনলে আপনার ছেলেকে পাবেন না।’
তিনি বলেন, ‘আমি তাকে বলি, আমরা গরিব মানুষ। এক লাখ টাকা কোথায় পাব? আমি কৃষিকাজ করি। তখন ওই ছেলে আমাকে দ্রুত খুলনায় চলে আসতে বলে। পরে সকালে খুলনায় এসে দেখি, আমার ছেলে আর বেঁচে নেই।’
আজমুলকে ভাত চুরির অভিযোগে মারধর করা হয়েছে—এমন দাবি করা হলেও ঘটনাটি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। রাতে নিহতের বাবার কাছে ফোন করে এক লাখ টাকা দাবি করা, আজমুলকে ছাদে নিয়ে মারধরের অভিযোগ, পরে ছাদ থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার ঘটনা, গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া এবং মৃত্যুর পর তাকে হাসপাতালে রেখে চলে যাওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া আজমুলের মাথার চুল কাটা ছিল কেন, তা নিয়েও পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এসব কারণে আজমুলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ ও প্রশ্নের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শনিবার রাতে নিহত আজমুলের বাবা মো. কুতুব উদ্দিন হরিণটানা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীসহ অজ্ঞাতনামা ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন—খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোটেকনোলজি বিভাগের ২৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী ওবায়দুল, গণিত বিভাগের ১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী সাগর, ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের ১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী রবিন এবং একই বিভাগের ১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী মবিন। ওবায়দুল ছাড়া অন্যরা সাবেক শিক্ষার্থী বলে জানা গেছে।
হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা হয়েছে। আমরা প্রতিটি তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখছি। ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা দ্রুত গ্রেপ্তার হবে। নিরীহ কেউ যাতে হয়রানি না হয়, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।’
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) সহকারী কমিশনার হুমায়ুন কবির বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনগতভাবে যা যা করার প্রয়োজন, পুলিশ তা করবে।
রবিবার দুপুরে আজমুল হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করেছেন শিক্ষার্থীরা। মানববন্ধনে তারা হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক মো. সালাউদ্দিন বলেন, ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে ঘটেছে। ফলে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি কোনো এখতিয়ার নেই। তবে ঘটনা জানার পর থেকেই পুলিশ প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হচ্ছে।
নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কানাই লাল সরকার জানান, গত ১০ সেপ্টেম্বর আজমুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার মা-বাবার সঙ্গে কথা বলেছে এবং তাদের আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।
ইংরেজি বিভাগের প্রধান মেহেদী হাসান বলেন, ‘আজমুল গত ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এ পর্যন্ত সে মাত্র তিন দিন ক্লাস করেছে। মৃত্যুর খবর শুনে আমরা মর্গে গিয়ে তার পরিবার ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।’
আজমুলের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে রোববার রাত ১০টার দিকে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানাধীন তিতুদহ ইউনিয়নের বড়শলুয়া গ্রামের নিজ বাড়িতে পৌঁছায়। লাশ বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। তাকে শেষবারের মতো দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন শত শত নারী-পুরুষ।
পরে রাত ১১টার দিকে জানাজা নামাজ শেষে স্থানীয় গ্রাম্য কবরস্থানে আজমুল হোসেনকে দাফন করা হয়। তার মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
খুলনা নগরীর একটি ছাত্রমেসে আজমুল হোসেন (২১) বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা করে মেসের সহপাঠীরা। এ ঘটনায় নিহতের বাবা মো. কুতুব উদ্দিন বাদী হয়ে হরিণটানা থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীসহ অজ্ঞাতনামা ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
নিহত আজমুল হোসেন চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানাধীন তিতুদহ ইউনিয়নের বড়শলুয়া গ্রামের মো. কুতুব উদ্দিনের ছেলে। তিনি খুলনার বেসরকারি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পড়াশোনার জন্য প্রায় এক বছর আগে খুলনায় এসে মেসে ওঠেন আজমুল। গত বছর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি তিনি। পরে গত ১০ সেপ্টেম্বর নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। ভর্তি হওয়ার পর মাত্র তিন দিন ক্লাস করেন। শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে চুয়াডাঙ্গার বাড়ি থেকে খুলনায় ফিরে মেসে ওঠেন তিনি। এরপর রবিবার লাশ হয়ে বাড়ি ফিরল আজমুল হোসেন।
আরও পড়ুন:







