ভৌগোলিক দিক থেকে রাজবাড়ী ও কুষ্টিয়া দুই জেলার সীমান্তঘেঁষা একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্মাণ করা হয় ১০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল । উদ্বোধনের পর কেটে গেছে প্রায় ১০ বছর। অথচ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন তিনতলা ভবন, ১০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল, সুসজ্জিত অপারেশন থিয়েটার (ওটি) কিংবা আলট্রাসনোগ্রাম কক্ষ সবই এখন নামকাওয়াস্তে পড়ে আছে।
প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার কলিমহর ইউনিয়নে নির্মিত ‘মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি’ এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। অযত্ন ও অবহেলায় নষ্ট হতে বসেছে ভবনের নানা অংশ এবং কোটি টাকার স্পর্শকাতর চিকিৎসাসামগ্রী। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজারো গর্ভবতী মা ও শিশু কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন।
উপজেলার কলিমহর ইউনিয়নে ৫০ শতক জমির ওপর নির্মিত ১০ শয্যাবিশিষ্ট এই মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি ২০১৭ সালের ২০ নভেম্বর উদ্বোধন করেন তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. জিল্লুল হাকিম। কথা ছিল কেন্দ্রটিতে ২৪ ঘণ্টা গর্ভবতী মায়েদের চিকিৎসাসেবা, স্বাভাবিক ও জটিল প্রসব, সিজারিয়ান অপারেশন, প্রসব-পরবর্তী যত্ন, নবজাতকের চিকিৎসা এবং জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক শনাক্তকরণসহ পরিবার পরিকল্পনার নানা ধরনের সেবা প্রদান করা হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসস্থানের জন্য নির্মাণ করা হয় ৬টি আবাসিক কোয়ার্টারও। তবে এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেবার সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।
২৪ ঘণ্টা সেবাদানের জন্য এই হাসপাতালে ২ জন মেডিকেল অফিসার, ৪ জন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, ১ জন ফার্মাসিস্ট, ১ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ পর্যাপ্ত কর্মচারী পদায়নের কাঠামো থাকলেও বাস্তবে সেখানে স্থায়ী কেউ নেই। বর্তমানে মাত্র সপ্তাহে একদিন অতিরিক্ত দায়িত্বে একজন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ও একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা এসে নামমাত্র দায়িত্ব পালন করেন।
অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা জাকিয়া সুলতানা ও মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট মো. আবুজার জানান, স্থায়ী জনবল না থাকায় এবং হাসপাতালটি নিয়মিত না খোলায় এলাকাবাসী জানেনই না যে এখানে সেবা পাওয়া যায়। স্থায়ী নিয়োগ দেয়া হলে প্রতিদিন শত শত মানুষ সেবা নিতে আসবেন বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
ভৌগোলিক দিক থেকে এলাকাটি রাজবাড়ী ও কুষ্টিয়াদুই জেলার সীমান্তঘেঁষা একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল। স্থানীয় আবুল কাশেম মিঞা ও উত্তম বিশ্বাস আক্ষেপ করে বলেন, "এখান থেকে পাংশা কিংবা কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। গভীর রাতে কোনো গর্ভবতী মায়ের প্রসববেদনা উঠলে বা জরুরি কোনো সমস্যা দেখা দিলে ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল। আমাদের ভোগান্তি কমাতেই এটি তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু ডাক্তার না থাকায় পুরো সরকারি উদ্যোগটিই ব্যর্থ হতে বসেছে।"
রাজবাড়ী জেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু নছর মোহাম্মদ কদর উদ্দীন বলেন, "হাসপাতালটির অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে পাংশা ও খোকসা দুই উপজেলার সীমান্ত এলাকার হাজার হাজার মানুষ উপকৃত হবেন। স্থায়ী জনবল পদায়নের জন্য আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার তাগিদ ও চিঠি দিয়েছি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে সরকার। বর্তমানে দেশের বাইরে আছেন তিনি। দেশে ফিরে বিষয়টি খোঁজ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কোটি কোটি টাকা খরচ করে অবকাঠামো তৈরি করে তা ফেলে রাখা সরকারি অর্থের চরম অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। বিশেষ করে প্রসূতি মা ও নবজাতকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে অনতিবিলম্বে প্রয়োজনীয় ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ দিয়ে কেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
আরও পড়ুন:







