দেশে মাদকের বিস্তার ঠেকানোর দায়িত্বে থাকা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধেও মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাতক্ষীরা, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে মাদকসহ তিন পুলিশ সদস্য ও এপিবিএনের এক সদস্য গ্রেপ্তারের ঘটনায় মাদকবিরোধী অভিযান ও সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সাতক্ষীরায় মাদক কারবারিদের ধরতে অভিযান চালানোর সময় গত ৬ সেপ্টেম্বর দুই পুলিশ সদস্য মাদকসহ গ্রেপ্তার হন। একই দিনে কক্সবাজারের রামুতে ৫৪ হাজার ইয়াবাসহ এপিবিএনের এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করে বিজিবি। এর আগে গত ৫ মে চট্টগ্রামে ৫০ হাজার ইয়াবাসহ খুলনা জেলা পুলিশের এক কনস্টেবল গ্রেপ্তার হন।
সাতক্ষীরায় দুই পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার
গত ৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বকচরা বাইপাসসংলগ্ন এলাকা থেকে মো. মোস্তাইন বিল্লাহ (৩০) ও নাজমুল (২৮) নামের দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।
মোস্তাইন বিল্লাহ জেলা পুলিশের স্টাফ ফোর্স শাখায় কর্মরত ছিলেন। নাজমুল জেলা পুলিশের ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
সংশ্লিষ্ট থানার ওসি মাহমুদুর রহমান জানান, এ ঘটনায় ডিবির একজন কর্মকর্তা বাদী হয়ে মামলা করেছেন এবং তিনিই মামলাটির তদন্ত করছেন। উদ্ধার করা আলামত পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। আদালতের মাধ্যমে দুই পুলিশ সদস্যকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
রামুতে ৫৪ হাজার ইয়াবাসহ এপিবিএন সদস্য
একই দিনে কক্সবাজারের রামুতে এপিবিএন সদস্য মোহাম্মদ আলী মুন্না শিকদারকে (২৭) ৫৪ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে বিজিবি।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, তাঁর কাছ থেকে একটি মোটরসাইকেল, দুটি আইফোন ও নগদ ৫০ হাজার ৯৯০ টাকা জব্দ করা হয়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে রামু থানায় মামলা করা হয়।
চট্টগ্রামে ৫০ হাজার ইয়াবাসহ পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার
এর আগে গত ৫ মে চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার নতুন ব্রিজ এলাকায় ৫০ হাজার ইয়াবাসহ আশিকুল ইসলাম (৩০) নামের এক পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি খুলনা জেলা পুলিশের কনস্টেবল হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের বরাতে বলা হয়, কক্সবাজার থেকে ইয়াবার একটি বড় চালান সংগ্রহ করে তিনি খুলনায় নিয়ে যাচ্ছিলেন।
মাদক নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীলদের জবাবদিহির দাবি
অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, তিনটি ঘটনার সময়, স্থান ও প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও মাদকবিরোধী আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেই মাদক বহন, সংরক্ষণ ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের মতে, শুধু মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার নয়, আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা সদস্যদের বিরুদ্ধেও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক তদন্ত প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কোনো সদস্য মাদকসহ গ্রেপ্তার হলে শুধু তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করাই যথেষ্ট কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। তিনি কীভাবে মাদক সংগ্রহ করেছেন, কার কাছ থেকে পেয়েছেন, কোথায় নিয়ে যাচ্ছিলেন, তাঁর সঙ্গে আর কারা যুক্ত এবং দায়িত্ব পালনের সুযোগ ব্যবহার করে কোনো সুবিধা নিয়েছেন কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শুধু মামলা ও বরখাস্তের মাধ্যমে এ ধরনের প্রবণতা দূর করা যাবে না। বিপুল পরিমাণ মাদকসহ কোনো বাহিনীর সদস্য গ্রেপ্তার হলে সরবরাহকারী, পরিবহন, অর্থ লেনদেন এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়েও তদন্তের গুরুত্ব বাড়ে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, কোনো পুলিশ সদস্য মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য বা প্রমাণ তদন্তে পাওয়া গেলে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি-বিধান অনুযায়ী তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, মাদক সেবনের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত সন্দেহভাজন কিছু পুলিশ সদস্যকে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। মাদক সেবন বা কারবারে জড়িত থাকার বিষয়টি কড়া নজরদারিতে রয়েছে। ডোপ টেস্টে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্য শনাক্ত হলে চাকরিচ্যুতিসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন:







