চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। চলতি বছরের আগস্ট থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় দেড় মাসে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও স্থানীয় পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আড়াই শতাধিক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। আক্রান্তদের বড় একটি অংশ তরুণ। বর্ষা ও সাম্প্রতিক বন্যা-পরবর্তী সময়ে থেমে থেমে বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও তীব্র আর্দ্রতার কারণে এডিস মশার প্রজনন বাড়ায় ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে চিকিৎসকেরা মনে করছেন।
বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে গত ৪৫ দিনে অন্তত ১৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর বাইরে স্থানীয় চিকিৎসকদের পরামর্শে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করে ডেঙ্গু পজিটিভ হয়েছেন এবং চিকিৎসা নিয়েছেন–এমন রোগীর সংখ্যা দেড় শতাধিক বলে জানা গেছে। ফলে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা হাসপাতালের নথিভুক্ত রোগীর চেয়ে আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হাসপাতালভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দেড় মাসে বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪৮ জন এবং বর্হিবিভাগে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ২০০ জন, বেসরকারি হাসপাতাল জরিপে বাঁশখালী জেনারেল হাসপাতাল লিমিটেডে ১৬ জন, বাঁশখালী ন্যাশনাল হাসপাতাল লিমিটেডে ৬ জন, বাঁশখালী মাতৃসদন ও মা-শিশু জেনারেল হাসপাতালে ২ জন, অ্যাপোলো হাসপাতাল লিমিটেডে ৮ জন, জলদী আধুনিক হাসপাতাল লিমিটেডে ১৬ জন, গুনাগরি আধুনিক হাসপাতালে ১৮ জন, গুনাগরি মা-শিশু জেনারেল হাসপাতালে ১৩ জন, গুনাগরি আয়েশা সিদ্দিকা হাসপাতালে ৭ জন, উপকূলীয় জেনারেল হাসপাতালে ১ জন এবং পুকুরিয়া সিভি হাসপাতালে ১ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শনাক্ত রোগীদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ৩০ বছর কিংবা ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, ডেঙ্গুর সাধারণ উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর পাশাপাশি জটিলতা দেখা দিয়েছে–এমন রোগীও হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। বিশেষ করে রক্তের প্লাটিলেট কমে যাওয়া, পানিশূন্যতা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে প্লাজমা লিকেজের মতো জটিলতার ঝুঁকি রয়েছে। জটিল রোগীদের অনেককেই উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে। তবে বাঁশখালীতে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও মশক নিধনে দৃশ্যমান কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। বাঁশখালী পৌরসভা ও বিভিন্ন ইউনিয়নে নিয়মিত ফগিং, লার্ভিসাইড বা বিটিআই প্রয়োগ এবং নালা-নর্দমা পরিষ্কারের কার্যক্রম জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বাঁশখালী পৌরসভা, বৈলছড়ী, কালীপুর, চাম্বল ও শেখেরখীলসহ কয়েকটি এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। রোগীর চলাচল ও বসবাসের এলাকা বিবেচনায় নিয়ে হটস্পট চিহ্নিত করে সেখানে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু ফগিং করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এডিস মশা সাধারণত বাড়িঘরের আশপাশে জমে থাকা অল্প পরিমাণ পরিষ্কার পানিতে বংশবিস্তার করে। তাই নিয়মিত বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার ও নির্মাণসামগ্রীর মধ্যে জমে থাকা পানি অপসারণের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত পরিচ্ছন্নতা ও লার্ভা ধ্বংস কার্যক্রম প্রয়োজন।
এদিকে ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে হাসপাতালের হিসাব ও স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে সমন্বিত তথ্য প্রকাশের দাবি উঠেছে।
বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মুমিনুল হক বলেন, 'সারাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। বাঁশখালীতেও একই অবস্থা। প্রতিদিনই ডেঙ্গুরোগী সনাক্ত হচ্ছে। আমাদের হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর জন্য ৫টি ব্লক রয়েছে, এর বাইরেও ১০ থেকে ১১টি আলাদা বেডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গত আগস্ট থেকে আজ পর্যন্ত (রিপোর্ট লেখাপর্যন্ত) হাসপাতালে ৪৮ জন রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ফিরছেন। বর্হিবিভাগে চিকিৎসা ও পরামর্শ নিয়েছেন প্রায় ২০০ জন। অনেকে হোমট্রিটমেন্ট নিয়েছেন বলেও জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, বাঁশখালীতে বয়ে যাওয়া বন্যা ও বর্ষার সিজন থেকে জমে যাওয়া পানি থেকে এ মশা ছড়াচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই ইউনিয়ন ও পৌরসভাভিত্তিক মশক নিধন, প্রজননস্থল ধ্বংস এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। অন্যথায় বর্ষা-পরবর্তী সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
শিব্বির আহমদ রানা,বাঁশখালী প্রতিনিধি
আরও পড়ুন:





.jpg)

