রবিবার

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৫ আশ্বিন, ১৪৩৩

ফরিদপুরে কৃষকদের অভিযোগ সার ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়; তদন্তের দাবি

শরিফুল ইসলাম,ফরিদপুর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৭:২৬

শেয়ার

ফরিদপুরে কৃষকদের অভিযোগ সার ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়; তদন্তের দাবি
ছবি: বাংলা এডিশন

সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে ফরিদপুরের বিভিন্ন বাজারে। কৃষকদের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় সরকারি দামে সার না পেয়ে তাঁদের বাড়তি টাকা দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও সারের সঙ্গে অতিরিক্ত পণ্য কিনতে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে।

কৃষকদের দাবি, সরকার ভর্তুকি দিয়ে সার সরবরাহ করলেও মাঠপর্যায়ে তার সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না। চাহিদা বাড়ার সুযোগ নিয়ে কিছু ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা বাড়তি দামে সার বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ তাঁদের।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ফরিদপুরে ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সারের সংকট নেই। তবে কৃষকদের অভিযোগ, জেলা সদরসহ ভাঙ্গা, বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, মধুখালী, চরভদ্রাসন, সদরপুর, নগরকান্দা ও সালথার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি মূল্য ও বাজারদরের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

সরকারি নির্ধারিত খুচরা মূল্য অনুযায়ী, ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া ও টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা এবং এমওপি ১ হাজার টাকায় বিক্রির কথা।

কৃষকদের অভিযোগ, ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ডিএপি নিয়ে। সরকারি মূল্য ১ হাজার ৫০ টাকা হলেও কোথাও কোথাও তা ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।

অনেক কৃষক অভিযোগ করেন - “সরকারি দামের চেয়ে বেশি টাকা নেওয়ার পাশাপাশি অনেক সময় সারের সঙ্গে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির পণ্য কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনের সার নিতে গেলে এসব পণ্যও নিতে হয়।”

কয়েকজন খুচরা সার ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, তাঁরা অনেক সময় বিএডিসি ডিলারদের কাছ থেকে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে সার কিনছেন। ফলে তাঁদের পক্ষেও সরকারি দামে সার বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে দাবি তাঁদের।

অন্যদিকে কৃষকদের অভিযোগ, কিছু ডিলার ইউনিয়ন পর্যায়ে সার নেই বলে জানালেও একই সার খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করছেন। ডিলারের কাছ থেকে সার নেয়ার সময় রশিদ না দেয়ার অভিযোগও রয়েছে।

কৃষকদের আরও অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রশিদে সরকারি মূল্য উল্লেখ থাকলেও রশিদের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেয়া হচ্ছে। ফলে সরকারি দামে ডিলারের কাছ থেকে সার না পেয়ে তাঁদের খুচরা বাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বিএডিসি ও বিসিআইসি ডিলার দাবি করেন, সার উত্তোলনের সময় সরকারি রসিদের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। তাঁদের অভিযোগ, গুদাম থেকে সার উত্তোলনের সময় বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত অর্থ নেয়া হলেও এর কোনো রশিদ বা চালান দেয়া হয় না।

তবে কয়েকজন ডিলার জানান, মৌসুমে চাহিদা বেড়ে গেলে তাঁরা যশোরের নওয়াপাড়া থেকেও সার সংগ্রহ করেন। বাইরে থেকে সার সংগ্রহের ক্ষেত্রে পরিবহনসহ বিভিন্ন খরচ বেশি হওয়ায় দাম বাড়ে বলে তাঁদের দাবি।

ফরিদপুর সার ডিলারদের সংগঠন ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুস সালাম মিয়া (বাবু) ডিলারদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, ফরিদপুরে বর্তমানে পর্যাপ্ত পরিমাণে সার রয়েছে। জেলার বিসিআইসি ও বিএডিসির মোট ১৪৪ জন ডিলার রয়েছেন। পেঁয়াজ চাষের মৌসুমে একসঙ্গে অনেক কৃষক সার ব্যবহার করায় বাজারে সাময়িক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তবে তাঁর জানামতে বর্তমানে কোনো সারের সংকট নেই।

ডিলারদের বিরুদ্ধে রসিদের বাইরে টাকা নেয়া, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং সারের সঙ্গে অন্য পণ্য কিনতে বাধ্য করার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এই ধরনের বিষয়ে আমি অবগত নই।”

ফরিদপুরের টেপাখোলা সার গুদামের উপসহকারী পরিচালক এম এ জাকির বলেন, “আমি এই বিষয়টি নিয়ে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে পারব না। এটা আমাদের সহকারী পরিচালক কায়ুম মল্লিক স্যারের নিষেধ আছে। আমি শুধু মেমো কেটে দিই এবং হিসাব ঠিকঠাক রাখি।”

তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গুদামের সহকারী পরিচালক মো. কায়ুম মল্লিকের কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি রাজবাড়ীতে জরুরি সভায় থাকার কথা জানান।

পরে রাতে তিনি প্রতিবেদককে ফোন করে বলেন, “এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমার বিরুদ্ধে উপসহকারী পরিচালক এম এ জাকির সম্ভবত মিথ্যা কথা বলেছেন। আমার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন।”

অভিযোগের বিষয়ে ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাহাদুজ্জামান বলেন, ফরিদপুরে কোনো ধরনের সারের সংকট নেই। নিয়মিত মাঠপর্যায়ে মনিটরিং করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, কোনো ডিলার এ ধরনের কাজে জড়িত থাকলে বা কোনো কৃষক অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। সার কেনার সময় কৃষকদের রশিদ দেয়া হচ্ছে এবং তাঁদের মোবাইল নম্বরও সংরক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

জেলায় সারের সংকট না থাকার কথা কৃষি বিভাগ জানালেও সরকারি মূল্য ও বাজারদরের পার্থক্য এবং রসিদের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কৃষকদের দাবি, গুদাম থেকে সার উত্তোলন, ডিলার পর্যায়ে বিতরণ এবং খুচরা বাজারে বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে রসিদের বাইরে অর্থ নেওয়া, সারের সঙ্গে অন্য পণ্য কিনতে বাধ্য করা এবং গুদাম পর্যায়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তাঁদের।

কৃষকদের ভাষ্য, সরকারি ভর্তুকির সার যদি নির্ধারিত মূল্যে তাঁদের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যায়। তাই সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।