শিক্ষা, গবেষণা, সাংগঠনিক নেতৃত্ব, সামাজিক উন্নয়ন ও মানবসেবায় বহুমাত্রিক অবদান রেখে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছেন অধ্যাপক ড. মো. তৌফিকুল ইসলাম মিথিল। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক আন্দোলন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সংগঠন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডেও দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় তিনি।
বর্তমানে তিনি পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (PKSF)-এর গভর্নিং বডির সদস্য, বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পরিষদের সভাপতি, ইউনিভার্সিটি অব ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি, ঢাকার হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি, নাগরিক কণ্ঠ ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং তৌফিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অধ্যাপক ড. মো. তৌফিকুল ইসলাম মিথিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের ফুলবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরতলীর মোহাম্মদপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী হাজারী বংশে।
তাঁর বাবা সরকারি চাকরি দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে পরবর্তীতে ব্যবসায় যুক্ত হয়ে নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হন। মা একজন ‘রত্নগর্ভা মা’ হিসেবে পরিচিত। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে ড. মিথিল দ্বিতীয়। তাঁর ভাইদের কেউ গবেষণা, কেউ চিকিৎসা আবার কেউ অধ্যাপনা পেশায় যুক্ত; একমাত্র বোনও শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত।
শৈশবেই নানার সান্নিধ্যে ইসলামিক জ্ঞান ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। তাঁর নানা ছিলেন একজন বিশিষ্ট আলেম। সেই পারিবারিক পরিবেশ তাঁর চিন্তা, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই সন্তানের জনক।
শৈশবে প্রাণচঞ্চল ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন ড. মিথিল। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, স্কাউটিং, সাহিত্য ও বিতর্কে তাঁর ছিল সক্রিয় অংশগ্রহণ। জেলা পর্যায়ে নিয়মিত ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ের একজন সাঁতারু হিসেবেও তিনি পরিচিতি লাভ করেন। শৈশব-কৈশোরের এসব অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে তাঁর নেতৃত্বগুণ ও সাংগঠনিক দক্ষতা বিকাশে ভূমিকা রাখে।
১৯৮৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৯০ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন ড. মিথিল। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার ধারাবাহিকতায় জাপানের শিমানে ইউনিভার্সিটি থেকে আঞ্চলিক উন্নয়ন বিষয়ে দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তত্তোরি ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
তাঁর গবেষণার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র রাজনীতি, নেতৃত্ব, সুশাসন ও উন্নয়ন ব্যবস্থা। পাশাপাশি বাংলাদেশ, ভারত ও জাপানের শাসনব্যবস্থা ও বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়া, সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণাপদ্ধতি, আঞ্চলিক উন্নয়ন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি, দারিদ্র্য বিমোচন, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি নিয়েও তিনি দীর্ঘদিন গবেষণা ও একাডেমিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত।
শিক্ষা ও গবেষণায় আন্তর্জাতিক পর্যায়েও রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা। ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত জাপান সরকারের Monbukagakusho (MEXT) স্কলারশিপের আওতায় তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত জাপানের কিয়োটো ইউনিভার্সিটিতে JSPS পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপে গবেষণা করেন। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের World Learning Program-এর ফেলোশিপও অর্জন করেন। এই আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা তাঁর একাডেমিক চিন্তা ও উন্নয়ন-দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
ড. মিথিলের সাংগঠনিক ও নেতৃত্বের যাত্রা শুরু ছাত্রজীবন থেকেই। কলেজ জীবনে ১৯৮৮-৮৯ মেয়াদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সাহিত্য ও বিতর্ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯০-৯২ সালে জেলা ছাত্রদলের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৯২-৯৩ সালে আল-বেরুনী হল ছাত্র সংসদের আন্তঃক্রীড়া সম্পাদক এবং একই হলের জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯৪-৯৬ মেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৯২-৯৪ সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির কার্যনির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে বিএনপির মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী ছিলেন।
একাডেমিক অঙ্গনেও ড. মিথিলের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনি আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশে (AIUB) অধ্যাপনা করেন। এরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (NSU) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জাপানে অধ্যয়ন ও গবেষণার সময় নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংগঠনের নির্বাচিত সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
বর্তমানে শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে কাজ করছেন। ইউনিভার্সিটি অব ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রতিষ্ঠাকালীন বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি Japanese Universities Alumni Association in Bangladesh (JUAAB)-এর নির্বাচিত যুগ্ম সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ইউএস স্টেট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আর্কাইভ ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক গণআন্দোলন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ড. মিথিলের সক্রিয় ভূমিকার কথা তাঁর পরিচিতজনেরা উল্লেখ করেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রেও তিনি সক্রিয় ছিলেন বলে তাঁর পরিচিত মহল জানায়।
সাবলীল বক্তা হিসেবে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের বিভিন্ন টকশো ও আলোচনায় নিয়মিত অংশ নিয়ে থাকেন তিনি। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাইবার নিরাপত্তা আইন ও সীমান্ত হত্যাসহ বিভিন্ন নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় ইস্যুতেও তিনি প্রকাশ্যে বক্তব্য রেখেছেন।
শিক্ষা ও গবেষণার বাইরে মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও ড. মিথিলের সম্পৃক্ততা রয়েছে। বিশেষ করে নিজ এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং অসহায় মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন উদ্যোগে যুক্ত থাকার কথা তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা জানান। প্রচারের আড়ালে থেকে মানুষের জন্য কাজ করাকে তিনি বেশি গুরুত্ব দেন এমনটাই তাঁর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিচিতদের ভাষ্য।
শিক্ষা ও গবেষণার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক নেতৃত্ব, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক মূল্যবোধ এই চারটি ক্ষেত্রকে সমন্বয় করে এগিয়ে চলেছেন অধ্যাপক ড. মো. তৌফিকুল ইসলাম মিথিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় পরিসর থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর দীর্ঘ পথচলা তাঁকে একজন বহুমাত্রিক শিক্ষাবিদ, গবেষক ও সংগঠক হিসেবে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
আরও পড়ুন:







