হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার কুশিয়ারা নদীতে আবারও শুরু হয়েছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের প্রতিযোগিতা। নদীর বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ড্রেজার মেশিন বসিয়ে প্রকাশ্যে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এতে নদীর তীরবর্তী বসতবাড়ি, কৃষিজমি, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং কুশিয়ারা নদীর উভয় তীরে প্রায় ৫৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন প্রতিরক্ষামূলক বাঁধ ও তীররক্ষা প্রকল্প ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের চোখের সামনেই দীর্ঘদিন ধরে কুশিয়ারা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। নদীর তলদেশ থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ ও তলদেশের ভারসাম্য পরিবর্তনের পাশাপাশি নদীতীরে ভাঙন আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, সরকার পরিবর্তনের পর অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে—এমন প্রত্যাশা ছিল তাদের। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। বরং নদীর বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কুশিয়ারা নদীর সংশ্লিষ্ট এলাকায় বর্তমানে মা এন্টারপ্রাইজ ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বৈধভাবে বালু উত্তোলনের অনুমোদন নেই। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এ অনুমোদনের বাইরে একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে নদী থেকে বালু তুলছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন অন্তত ৬ থেকে ৭টি প্রতিষ্ঠান বা চক্রের লোকজন বিভিন্ন এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করছে। বিশেষ করে দীঘলবাক মৌজার দুর্গোয় ও গালিমপুর, আউশকান্দি ইউনিয়নের পাহাড়পুর, পারকুলসহ কুশিয়ারা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগে ওয়াহিদ এন্টারপ্রাইজ, তালুকদার এন্টারপ্রাইজ, সাজু আহমেদ, দুলু মেম্বার, বালু আশরাফসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, তাদের কেউ কেউ নিজেদের বৈধ দাবি করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকার কথা জানিয়েছেন।
সরেজমিন দীঘলবাক, দুর্গোয়, পাহাড়পুর, পারকুল, গালিমপুর ও মাধবপুর এলাকায় গিয়ে কুশিয়ারা নদীতে একাধিক ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলনের দৃশ্য দেখা যায়। বালু উত্তোলনের কাজে নিয়োজিত ছিলেন বিপুলসংখ্যক শ্রমিক।
নদী থেকে পাইপের মাধ্যমে কয়েক কিলোমিটার দূরে বিভিন্ন স্থানে বালু নিয়ে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। দীঘলবাক ও তাজাভাদ মৌজায় উত্তোলিত বালু বড় নৌকায় করে নদীর তীরবর্তী এলাকা ও কৃষিজমির পাশে নিয়ে রাখা হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানান।
এছাড়া ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে পিতুয়া গ্রামের কাছেও কয়েকটি স্থানে সাদা বালুর বড় বড় স্তূপ দেখা গেছে। পারকুল বিদ্যুৎকেন্দ্রসংলগ্ন এলাকা, মজিদপুর, কুমারকাড়া মন্দিরের কাছাকাছি স্থান, দীঘলবাকসহ বিভিন্ন এলাকায় পাইপের মাধ্যমে নদী থেকে বালু এনে মজুত করার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব বালু পরে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে।
কুশিয়ারা নদীর তীর রক্ষায় উভয় তীরে প্রায় ৫৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন প্রতিরক্ষামূলক বাঁধ ও তীররক্ষা প্রকল্প রয়েছে। নদীর তলদেশ থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে এসব স্থাপনা ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মতে, নদীর নির্দিষ্ট স্থান থেকে অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে কোথাও কোথাও নদীর গভীরতা বেড়ে যাচ্ছে। এতে নদীর স্রোতের চাপ তীরের দিকে বাড়লে ভাঙন তীব্র হতে পারে। ইতোমধ্যে কয়েকটি এলাকায় নদীতীর ও বসতবাড়িতে ভাঙনের চিহ্ন দেখা দিয়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।
দুর্গোয় গ্রামের বাসিন্দা মকরম আলী বলেন, প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন করা হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় গ্রামের মানুষ হতাশ। নদী থেকে এভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
গ্রামবাসী আশরাফ উদ্দিন বলেন, কুশিয়ারা নদীর উভয় তীরে নির্মাণাধীন প্রতিরক্ষামূলক বাঁধসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করা হলে ভাঙনের ঝুঁকি আরও বাড়বে।
স্থানীয় বাসিন্দা মুশাহিদ আলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকা থেকে সাদা বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদী ও নদীতীরের ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়েছে। অনেক জায়গায় বাড়িঘরেও ভাঙন দেখা দিয়েছে।
আরেক বাসিন্দা আবু মিয়া অভিযোগ করেন, বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাধারণ মানুষ ভয় পান। তিনি বলেন, অনুমোদন না থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন করে পরিবেশের ক্ষতি করা হচ্ছে।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি ও রাজনীতিকের অভিযোগ, বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশের সম্পৃক্ততা রয়েছে। কারও কারও দাবি, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—উভয় দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের কেউ কেউ এই বালু ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
এমনকি স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর উপজেলার শীর্ষ পর্যায়ের এক বিএনপি নেতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি বালু উত্তোলন করছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। যাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে, তাদের বক্তব্যও প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি।
হবিগঞ্জ জেলা বাপার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন পরিবেশের জন্য অত্যন্ত হুমকিস্বরূপ। বর্তমানে এর ক্ষতি কম মনে হলেও ভবিষ্যতে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি বলেন, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে ভাঙন বাড়তে পারে। কুশিয়ারা ডাইকসহ নদীর তীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তাই পরিবেশ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। সাজু আহমেদ বলেন, তারা তালুকদার এন্টারপ্রাইজের কাছ থেকে বালু কিনছেন এবং তাদের অনুমোদন রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
বালু উত্তোলনকারী চক্রের নেতা হিসেবে অভিযোগ ওঠা নুরুল আমিন বলেন, তাদের ১০ থেকে ১২ জনের একটি দলগত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। তারা ওয়াহিদ এন্টারপ্রাইজ ও তালুকদার এন্টারপ্রাইজের কাছ থেকে বালু কিনছেন এবং তাদের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে।
ওয়াহিদ এন্টারপ্রাইজের পরিচালক ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, সরকারের নির্দিষ্ট জায়গা থেকে নির্দিষ্ট অনুমতি নিয়েই তারা বালু উত্তোলন করছেন। সাংবাদিকদের এ বিষয়ে এত মাথাব্যথা থাকার কথা নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তালুকদার এন্টারপ্রাইজের মালিক আশরাফ হোসেন ওরফে বালু আশরাফ বলেন, সরকারের রয়্যালটি দিয়ে বৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রি করছেন তিনি। তার দাবি, এখনো তার কাগজপত্রের মেয়াদ রয়েছে।
অন্যদিকে মা এন্টারপ্রাইজের মতিউর রহমান বলেন, তারা বৈধ কাগজপত্র নিয়েই বালু উত্তোলন করছেন। যারা অবৈধভাবে বালু তুলছেন, তাদের কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা জেরিন বলেন, মা এন্টারপ্রাইজ ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সংশ্লিষ্ট এলাকা থেকে বালু উত্তোলনের বৈধ অনুমোদন নেই।
তিনি বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসন এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে কোনো ধরনের সহায়তা করছে না বলেও জানান তিনি।
এখন প্রশ্ন উঠছে, নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ যদি সত্যিই থেকে থাকে, তাহলে প্রশাসনের ঘোষিত অভিযান কবে এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে? কারণ কুশিয়ারা নদীর তীর রক্ষায় যেখানে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, সেখানে নদীর তলদেশ থেকে অবাধে বালু উত্তোলন চলতে থাকলে সেই বিনিয়োগই বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু মাঝেমধ্যে অভিযান নয়, অবৈধ ড্রেজার জব্দ, জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং বালু মজুত ও পরিবহনের পেছনের পুরো চক্রকে চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। তা না হলে কুশিয়ারা নদীর ভাঙনে বসতবাড়ি, কৃষিজমি, তীররক্ষা বাঁধ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা আরও বাড়বে।
আরও পড়ুন:







