মঙ্গলবার

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩১ ভাদ্র, ১৪৩৩

স্বামী মানসিক প্রতিবন্ধী, স্ত্রীর একার লড়াই, অসমাপ্ত ঘরেই কাটছে জীবন

সবুজ সরকার,সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৩:৩৮

শেয়ার

স্বামী মানসিক প্রতিবন্ধী, স্ত্রীর একার লড়াই, অসমাপ্ত ঘরেই কাটছে জীবন
ছবি: বাংলা এডিশন

বিয়ের পর একটি সুখী সংসারের স্বপ্ন দেখেছিলেন মরিয়ম বেগম। স্বামী-সন্তান নিয়ে ভালোই চলছিল সংসার। কিন্তু হঠাৎ স্বামীর অসুস্থতা বদলে দেয় তাদের পুরো জীবন। ব্রেইনের সমস্যায় মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন স্বামী মো. সুরমান আলী। পরে দুর্ঘটনায় হারান একটি পা। এরপর থেকেই সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে মরিয়ম বেগমের কাঁধে।

সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার কুটিরচর গ্রামের বাসিন্দা সুরমান আলী একসময় কৃষিকাজ ও রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। স্ত্রী মরিয়ম বেগম ও দুই সন্তানকে নিয়ে ছিল তাদের ছোট্ট সংসার। কিন্তু অসুস্থতার পর আয়-রোজগারের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়।

স্বামীর বাড়িতে থাকার মতো জায়গা না থাকায় বাবার বাড়ির গ্রাম চৈরগাঁতী ভদ্রঘাঁটে আশ্রয় নেন মরিয়ম। সেখানেও নিজের কোনো জমি ছিল না। পরে প্রতিবেশীদের যাকাত-ফিতরা ও বিভিন্ন সহায়তায় অন্যের জমিতে একটি ঘর তোলা হয়। কিন্তু অর্থের অভাবে সেই ঘরের নির্মাণকাজ শেষ করতে পারেননি তারা।

ফলে মাথার ওপর ঘর থাকলেও সেখানে ওঠার সুযোগ নেই। জরাজীর্ণ খড়ের ঝুপড়িই এখন পরিবারটির একমাত্র আশ্রয়।

বিদ্যুৎ নেই, নেই ফ্যান কিংবা পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা। রাত নামলেই অন্ধকারে কাটে তাদের সময়। একদিকে মানসিকভাবে অসুস্থ স্বামীর দেখাশোনা, অন্যদিকে দুই সন্তানের খাবার ও সংসারের খরচ—সবকিছুই সামলাতে হচ্ছে মরিয়মকে।

সংসার চালাতে কখনো মানুষের বাড়িতে কাজ করেন, কখনো মিল-কারখানায় শ্রম দেন। দিনভর পরিশ্রম করেও অনেক সময় ঠিকমতো খাবার জোটে না। স্বামীর চিকিৎসা ও পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে অসমাপ্ত ঘরটি শেষ করার সামর্থ্য আর হয়ে ওঠে না।

মরিয়ম বেগম জানান, প্রতিবেশীরা বিভিন্ন সময়ে চাল, টাকা ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের সহায়তায় ঘরটিও তোলা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ঘরের কাজ শেষ করার মতো অর্থ এখনো জোগাড় করতে পারেননি তিনি।

প্রতিবেশী সাহানুর ইসলাম বলেন, পরিবারটির অবস্থা খুবই অসহায়। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী তারা সহযোগিতা করেছেন। তবে প্রয়োজনের তুলনায় সেই সহায়তা অপ্রতুল।

আরেক প্রতিবেশী গোলাপি বেগম জানান, দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটি মানবেতর জীবনযাপন করছে। স্বামী অসুস্থ ও শারীরিকভাবে অক্ষম হওয়ায় মরিয়মকেই সবকিছু করতে হচ্ছে। একটি নিরাপদ ঘর হলে পরিবারটির কষ্ট অনেকটাই কমত।

এ বিষয়ে কামারখন্দ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মোতালেব বলেন, অসহায় ও দুস্থ মানুষের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভিন্ন ধরনের সহায়তা ও অনুদানের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ নেই। পরিবারটি আবেদন করলে সরকারি সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা সম্ভব।

এক পাশে মানসিকভাবে অসুস্থ ও শারীরিকভাবে অক্ষম স্বামী, অন্য পাশে দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিদিনের যুদ্ধ—এভাবেই দিন কাটছে মরিয়ম বেগমের।

অন্যের জমিতে তোলা অসমাপ্ত ঘরটি যেন তাদের স্বপ্নের প্রতীক। ঘর আছে, কিন্তু সেখানে ওঠার সামর্থ্য নেই। তাই এখনো খড়ের ঝুপড়িতেই বন্দি তাদের নিরাপদ জীবনের স্বপ্ন।

সমাজের বিত্তবান মানুষ, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সহযোগিতা পেলে হয়তো অসমাপ্ত ঘরটির কাজ শেষ করে সেখানে মাথা গোঁজার সুযোগ পাবে পরিবারটি। সামান্য সহায়তাই হয়তো বদলে দিতে পারে মরিয়ম ও তার পরিবারের দীর্ঘদিনের কষ্টের জীবন।