সাভার ও আশুলিয়ায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর ঝটিকা মিছিলে রাজনৈতিক কর্মীদের পাশাপাশি দিনমজুর, রিকশাচালক, পোশাকশ্রমিক, রাজমিস্ত্রি ও ছিন্নমূল মানুষকে অর্থের বিনিময়ে অংশ নেওয়ানোর তথ্য সামনে এসেছে। স্থানীয় কিছু মধ্যস্বত্বভোগী এসব লোক সংগ্রহ করে মিছিলে যুক্ত করছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সাভার ও আশুলিয়ার পূর্বনির্ধারিত নির্জন স্থানে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ব্যানারে বেশ কয়েকটি ঝটিকা মিছিল হয়েছে। এসব মিছিলে ২০ থেকে ২৫ জনের বেশি লোক দেখা যায়নি। ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে সামনের সারির দুই থেকে তিনজন ছাড়া বাকিদের অধিকাংশই রাজনৈতিক কর্মী নন বলে দেখা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এক কাপ চা, একটি সিঙ্গারা কিংবা দিনশেষে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা দেওয়ার প্রলোভনে দিনমজুর, রিকশাচালক ও ছিন্নমূল পথশিশুদের মিছিলে আনা হয়। তাদের হাতে ব্যানার ধরিয়ে দিয়ে এক থেকে তিন মিনিটের মিছিল ও স্লোগানের ভিডিও ধারণ করা হয়। ভিডিও ধারণ শেষ হলে মূল আয়োজকেরা ব্যানার গুটিয়ে চলে যান।
বিপিএটিসির সামনে মিছিল, গ্রেপ্তার আট
সর্বশেষ রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সাভারের বিপিএটিসির সামনে ককটেল ফাটিয়ে ঝটিকা মিছিল করেন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। খবর পেয়ে পুলিশ সেখান থেকে আটজনকে গ্রেপ্তার করে।
পরিচয় যাচাই করে দেখা যায়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কেউই পদধারী বড় নেতা নন। তাদের মধ্যে রাজমিস্ত্রি, জুতার দোকানের কর্মচারী, পোশাকশ্রমিক ও সাধারণ শিক্ষার্থী রয়েছেন। পুলিশের দাবি, সাভার পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি পলাতক মাসুম দেওয়ানের অর্থায়নে তাদের ভাড়ায় আনা হয়েছিল।
মিছিলে অংশ নেওয়া আটজনের মধ্যে তিনজনকে ৩ হাজার টাকা এবং পাঁচজনকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়েছিল। তাদের মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে একই নম্বর থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়।
বিদেশ থেকে নির্দেশনা, মাঠে লোক সংগ্রহের অভিযোগ
অনুসন্ধান ও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ভারতে আত্মগোপনে থাকা সাভার উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজীব এসব মিছিলের সময়সূচি ও দিকনির্দেশনা দেন। তার পরামর্শে ভারতে থাকা পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা তানভীর আহম্মেদ তনু যোগাযোগ করেন ঢাকা জেলা উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক সায়েম মোল্লা ও সাভার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম রুবেলের সঙ্গে।
সায়েম মোল্লা ও রুবেল এ দায়িত্ব দেন সাভার পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনকে। আলমগীর মাঠপর্যায়ে লোক সংগ্রহের দায়িত্ব দেন তার ঘনিষ্ঠ রাজমিস্ত্রি আপনকে। প্রতি মিছিলে অন্তত শতাধিক লোক উপস্থিত করার লক্ষ্য দিয়ে আপনকে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পাঠানো হতো বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, সায়েম মোল্লা সরাসরি ইমরান হোসেন নামের আরেক ব্যক্তির কাছে মিছিলপ্রতি ৩০ হাজার টাকা পাঠাতেন। ইমরানের মাধ্যমে সেই অর্থের ভাগ পেতেন আপনের ভাই দুলাল। দুলাল মাঠপর্যায় থেকে দিনমজুর ও অলিগলির পথশিশুদের ৫০০ টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মিছিলে নিয়ে আসতেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
তবে কাজ শেষে প্রতিশ্রুত ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার পরিবর্তে অনেকের হাতে ১০০ বা ২০০ টাকা দেওয়া হতো। বাকি টাকা মধ্যস্বত্বভোগীরা আত্মসাৎ করতেন বলে জানা গেছে। মিছিলের ভিডিও ধারণ করে তা দ্রুত টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বিদেশে থাকা নেতাদের কাছে পাঠানো হতো।
রাজমিস্ত্রি ও ডেকোরেটর পরিচয়ে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ
সম্প্রতি তথ্য সংগ্রহকালে পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে, যাদের সাধারণ পরিচয় রাজমিস্ত্রি বা ডেকোরেটর দোকানি। অনুসন্ধানে গ্রেপ্তার আপন ও দুলাল দুই ভাই এবং ইমরানকে ঘিরে আরও তথ্য পাওয়া গেছে।
তাদের মোবাইল ফোনে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি ও মিছিল আয়োজনের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া তাদের কাছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অর্থ আসত। সেই অর্থ মিছিলসহ অন্যান্য কাজে ব্যয় করা হতো বলে জানা গেছে।
একইভাবে বিরুলিয়া বোট ক্লাব এলাকা থেকে মিছিলের প্রস্তুতিকালে সৌরভ নামে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের দারুসসালাম থানা আওয়ামী লীগের এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি নিজেকে নেতা পরিচয় দিলেও প্রবাসে থাকা নেতাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা এনে লোক ভাড়ার কাজে ব্যবহার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মিছিলে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া সোহাগ নামের এক কিশোর জানায়, তাকে ৫০০ টাকা দেওয়ার কথা বলে মিছিলে নেওয়া হয়েছিল। তার মতো আরও ১০ থেকে ১২ জনকে সে নিজেই ডেকে এনেছিল। পরে ভিডিও ফুটেজ দেখে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
আওয়ামী লীগ নেতার দাবি, আটক ব্যক্তিরা নিরীহ
ভাড়া করে ঝটিকা মিছিলের বিষয়ে সাভার সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সোহেল রানা ফোনালাপে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় কিছু কিশোর ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে কোনো কারণ ছাড়াই আটক ও হয়রানি করা হচ্ছে। তাদের রাজনৈতিকভাবে জড়িত থাকার বা অর্থ দিয়ে মিছিলে নেওয়ার দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
তিনি বলেন, কোনো পরিবারই চাইবে না তাদের সন্তানরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হোক। নিরীহ ছেলেদের নির্যাতন করে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা চলছে।
পুলিশের দাবি, বিদেশি অর্থায়নে সংগঠিত হচ্ছে মিছিল
বিরুলিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আল আমিন বলেন, সৌরভ নিজেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের দারুসসালাম থানা আওয়ামী লীগের সদস্য পরিচয় দিয়ে আমিনবাজার, হেমায়েতপুর ও গাবতলী এলাকায় প্রকাশ্যে মিছিলের সংগঠক ও অর্থায়নকারী হিসেবে কাজ করছিলেন। তিনি নিজে মিছিলে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে লোক ভাড়া করতেন।
আল আমিন বলেন, বিরুলিয়া এলাকায় নতুন করে মিছিলের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় সংবাদের ভিত্তিতে বোট ক্লাবের সামনে থেকে সৌরভকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডেকোরেটর ও রাজমিস্ত্রি চক্রের মতো সৌরভও প্রবাসে থাকা নেতাদের অর্থ ব্যবহার করে ঝটিকা মিছিলের নামে ভাড়াটে লোক সংগ্রহের বাণিজ্য চালাচ্ছিলেন বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ইমতিয়াজ বলেন, বিভিন্ন অ্যাপ ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে দেশ-বিদেশ থেকে অর্থের জোগান দিয়ে এসব কার্যক্রম সংগঠিত করা হচ্ছিল। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ছিন্নমূল মানুষদের টাকার লোভে মিছিলে আনা হচ্ছে। মূল অর্থায়নকারীদের বিষয়ে তদন্ত চলছে।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক মিছিলগুলোতে যারা সরাসরি যুক্ত ছিল এবং বিভিন্ন সাইট ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে দেশ-বিদেশ থেকে অর্থের জোগান দিয়ে এসব সংগঠিত করছিল, তাদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা সাংগঠনিকভাবে নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে পথশিশু ও ছিন্নমূল মানুষদের টাকার লোভে মিছিলে নেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। ঘটনার নেপথ্যে থাকা মূল অর্থায়নকারীদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই তাদের নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না।
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এসব ঘটনায় একটি গ্রুপ অর্থের জোগান দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে ভাড়া করে কাজ করাচ্ছে। তদন্ত ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মূল পরিকল্পনাকারীরা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতেই দিনমজুর বা ছিন্নমূল মানুষকে সহজ টার্গেট হিসেবে অল্প টাকার লোভে এসব কাজে ব্যবহার করছে। গ্রেপ্তার আসামিদের কাছ থেকে অর্থ জোগানদাতাদের কিছু নাম পাওয়া গেলেও তদন্তের স্বার্থে এবং অন্যদের গ্রেপ্তারের সুবিধার জন্য এখনই সেসব নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। মূল সংগঠকদের হেফাজতে আনা গেলে তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য উন্মোচিত হবে।
আরও পড়ুন:







