মঙ্গলবার

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩১ ভাদ্র, ১৪৩৩

ঢাকায় বাড়ছে বেওয়ারিশ লাশ, পরিচয় শনাক্তে বড় ঘাটতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:৩২

শেয়ার

ঢাকায় বাড়ছে বেওয়ারিশ লাশ, পরিচয় শনাক্তে বড় ঘাটতি
ছবি সংগৃহীত

কেউ খুঁজতে আসে না, থাকে না কোনো স্বজন বা দাবিদার। মর্গের ফ্রিজে দিনের পর দিন অপেক্ষার পর একসময় পরিচয়হীন এসব মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। রাজধানীতে এমন মরদেহের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি রাজধানীতে অজ্ঞাতনামা এক কিশোরীর খণ্ডিত মরদেহ এবং জাতীয় ঈদগাহ ও হাইকোর্ট মাজার এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্ঘটনা ও ভাসমান মানুষের মৃত্যুর পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের শিকার বহু পরিচয়হীন মানুষেরও এমন নিঃশব্দ পরিণতি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারত্বের ঘাটতি, সমন্বিত তথ্যভান্ডারের অভাব, অপরাধপ্রবণ এলাকায় প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, সোর্স নেটওয়ার্কের দুর্বলতা, আধুনিক ডিএনএ শনাক্তকরণ ব্যবস্থার ঘাটতি এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের অভাবে অনেক মরদেহ স্বজনদের কাছে ফিরতে পারছে না।

বছরভিত্তিক বাড়ছে বেওয়ারিশ মরদেহ

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ২ হাজার ১০৪টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করা হয়েছে।

এর মধ্যে ২০২৩ সালে ৪৯০টি, ২০২৪ সালে ৫৭০টি, ২০২৫ সালে ৬৪৪টি এবং ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করা হয়েছে। পরিসংখ্যানে গত কয়েক বছরে বেওয়ারিশ মরদেহের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফন সেবা কর্মকর্তা কামরুল আহমেদ জানান, হাসপাতাল থেকে যথাযথ কাগজপত্রসহ মরদেহ গ্রহণ করে কবরস্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়। এসব মরদেহের বেশিরভাগই জুরাইন ও রায়েরবাজার বধ্যভূমি কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় জুরাইন কবরস্থান এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ-সংলগ্ন কবরস্থানে বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করা হচ্ছে।

লাশ দাফনের জায়গা নিয়ে একসময় জটিলতা তৈরি হয়েছিল। এর ফলে অনেক বেওয়ারিশ মরদেহ দীর্ঘদিন মর্গে পড়ে ছিল। কামরুল আহমেদ বলেন, জায়গা-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে দীর্ঘদিন দাফনে সমস্যা হলেও এখন সেই সমস্যার সমাধান হয়েছে।

এক দিনেই উদ্ধার তিন অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীতে তিন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আদাবরের হাক্কারপাড় খালে ভেসে আসা একটি স্কুলব্যাগ থেকে খণ্ডিত অবস্থায় এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই দিনে জাতীয় ঈদগাহ ময়দান ও হাইকোর্ট মাজারের কাছে ফুটপাত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় আরও দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের একজনের বয়স আনুমানিক ৬৫ এবং অন্যজনের ৪৫ বছর।

আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর জানান, শনিবার বিকেল ৫টার দিকে ওই খাল থেকে একটি স্কুলব্যাগে কিশোরীর মরদেহের চারটি খণ্ড উদ্ধার করা হয়। এর প্রায় ১৮ ঘণ্টা পর তার দুটি পা উদ্ধার করা হয়। নিহত কিশোরীর বয়স ১৪ থেকে ১৬ বছর। এখনও তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।

ওসি জানান, নিহত কিশোরীর আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সার্ভারে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়। তবে তার এনআইডি না থাকায় আঙুলের ছাপের সঙ্গে মেলানোর মতো কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। খণ্ডিত মরদেহটি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের মর্গে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে আদাবর থানায় হত্যা মামলা করেছে।

অন্যদিকে, একই দিনে জাতীয় ঈদগাহ ময়দান ও হাইকোর্ট মাজারের কাছে ফুটপাত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান জানান, পথচারীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হাইকোর্ট মাজার ও জাতীয় ঈদগাহের কাছে ফুটপাত থেকে দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে একজনের পরিচয় জানা গেছে। তার নাম জুয়েল, বাড়ি লালবাগ। অন্যজনের পরিচয় এখনও জানা যায়নি।

পরিচয় শনাক্ত না হলে মর্গে রাখা হয়

পুলিশ জানায়, অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে তা স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে বেওয়ারিশ মরদেহ হিসেবে মর্গে রাখা হয়। এসব ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয় পুলিশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. আকতার হোসেন বলেন, বেওয়ারিশ লাশ বেড়েছে এমন তথ্য পুলিশের কাছে নেই। এ বিষয়ে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংখ্যা বেড়েছে কি না, তা পুলিশেরও জানা প্রয়োজন।

পুলিশের দক্ষতা ও প্রযুক্তি ব্যবহারে জোর বিশেষজ্ঞের

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, একটি দেশে বেওয়ারিশ লাশ তখনই বাড়বে, যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে নেই বলে ধরে নিতে হবে। অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা ও পেশাদারত্বের ঘাটতির সুযোগ নিচ্ছে। অপরাধ করে পার পাওয়া যায় এমন ধারণা তৈরি হওয়ায় বেওয়ারিশ লাশ বাড়ছে বলেও তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, অপরাধীরা হত্যার পর লাশ টুকরো করে ব্যাগে ভরে পানিতে ভাসিয়ে দিচ্ছে। এতে মরদেহ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তবে হত্যা ছাড়াও বিভিন্ন কারণে বেওয়ারিশ লাশ বাড়ছে। এসব নিয়ন্ত্রণে পুলিশ দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এই অপরাধ বিশেষজ্ঞের মতে, পুলিশের যে ঘাটতি রয়েছে, তা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকার করার মানসিকতা থাকতে হবে। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি পুলিশের সোর্স নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে হবে। এতে অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সহজ হবে। পাশাপাশি তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধ কমবে।