মঙ্গলবার

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩০ ভাদ্র, ১৪৩৩

সিরাজগঞ্জে এক বছরে ৪৮০৩ তালাক, বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২১:৪১

শেয়ার

সিরাজগঞ্জে এক বছরে ৪৮০৩ তালাক, বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

সিরাজগঞ্জে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ। নানা কারণে প্রতিদিনই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে মাদকাসক্তি, জুয়া, পরকীয়া, পারিবারিক সহিংসতা, বাল্যবিয়ে, যৌতুক, মোবাইল ফোনের আসক্তি, মানসিক নির্যাতনসহ বিভিন্ন কারণ রয়েছে।

জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সিরাজগঞ্জে ১৩ হাজার ৩১৭টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৩৬টি বিয়ে হয়েছে। বিপরীতে একই সময়ে তালাক নিবন্ধিত হয়েছে ৪ হাজার ৮০৩টি, যা প্রতিদিন গড়ে ১৩টি।

চলতি বছরের পরিসংখ্যান আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।

বিয়ের চেয়ে তালাক বেশি একটি কাজী অফিসে

শহরের একটি কাজী অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সেখানে ১৫২টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে। একই সময়ে তালাক নিবন্ধিত হয়েছে ১৫৭টি। অর্থাৎ ওই সময়ে বিয়ের চেয়ে তালাকের সংখ্যা বেশি।

অন্যদিকে, সদর উপজেলার কাজী সমিতির তথ্যে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত উপজেলায় ১ হাজার ৬৭০টি বিয়ে নিবন্ধনের বিপরীতে ৮৫০টি তালাক নিবন্ধিত হয়েছে।

এ বছর তালাক নিবন্ধনের সংখ্যা গতবারের তুলনায় তুলনামূলক বেশি বলে জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জ জেলা নিকাহ রেজিস্টার সমিতির সভাপতি কাজী নজরুল ইসলাম।

যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার মায়া

রায়গঞ্জ উপজেলার কোদলা গ্রামের শিখনের সঙ্গে মাত্র আট মাস আগে বিয়ে হয়েছিল ১৪ বছর বয়সী মায়া খাতুনের। অভিযোগ রয়েছে, নিকাহ রেজিস্টারের সামনে তাকে মারধর করে এবং গলায় ছুরি ঠেকিয়ে তালাকনামায় স্বাক্ষর নেওয়া হয়।

মায়ার বিধবা মা ৩০ হাজার টাকা যৌতুক বাকি রেখেছিলেন। এ কারণেই তাকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, সদর উপজেলার বাহুকা এলাকার তাসলিমার ছয় বছরের সংসারও ভেঙে গেছে। কাজী অফিসে এসে উভয়পক্ষের সম্মতিতে তালাকনামায় স্বাক্ষর করেন তারা। তাদের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। শাশুড়ির নির্যাতনের কারণে বাধ্য হয়ে তালাকের পথ বেছে নিয়েছেন বলে জানান তাসলিমা।

এক গৃহবধূ স্বামীর প্রতিদিন নেশা করে এসে অত্যাচারের অভিযোগ নিয়ে লিগ্যাল এইড অফিসে এসেছেন। এমন স্বামীর সঙ্গে তিনি আর সংসার করতে চান না।

নির্যাতন ও মামলায় ভাঙছে সংসার

সদর উপজেলার শিবনাথপুর গ্রামের দুই সন্তানের মা শিল্পীর অভিযোগ, স্বামী তাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর কিছুদিন পর তালাকনামা পাঠিয়েছেন। বিয়ের পর থেকেই স্বামী, শাশুড়ি, দেবর ও ননদের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানান তিনি। একাধিকবার মারধরের শিকার হলেও সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন বলেও জানান শিল্পী।

সলঙ্গার ফিরোজ হোসেন পাঁচ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন। তিন বছর সংসার করার পর হঠাৎ স্ত্রী তাকে তালাক দেন এবং আদালতে মামলা করেন। ওই মামলায় তিনি জেলও খেটেছেন। মামলায় তার পাশাপাশি বাবা ও বোনকেও আসামি করা হয়।

ফিরোজ জানান, মামলা হওয়ার পর টেনশন ও আতঙ্কে তার বাবাও মারা গেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আইনজীবীর সহকারী জানান, তার স্ত্রী স্মার্টফোন ব্যবহার করেন এবং বিভিন্ন সময়ে দামি পণ্য অনলাইনে অর্ডার করেন। সেগুলো কিনে দিতে না পারলে ঝগড়া হয় এবং তিনি বাবার বাড়ি চলে যান। এ কারণে তিনি তালাক দিতে চান। তবে তিনি নিজে ত্যাগ স্বীকার করে সংসার টিকিয়ে রেখেছেন বলে জানান।

মাদক, জুয়া ও পরকীয়ায় বেশি ভাঙছে সংসার

নিকাহ রেজিস্টার মো. শরিফ বলেন, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত তার অফিসে ১৫২টি বিয়ে ও ১৫৭টি তালাক নিবন্ধিত হয়েছে। তার মতে, স্বামীরা নেশা, জুয়াসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে পারেন না। এ কারণেও বেশি সংসার ভাঙে।

তিনি আরও বলেন, নারী ও পুরুষের কেউ কেউ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরকীয়ায় জড়ান। এ কারণেও বিচ্ছেদ ঘটে। একান্নবর্তী সংসারে অনেক নারী থাকতে চান না, এটিও সংসার ভাঙার একটি কারণ।

অনুসন্ধানে বিবাহ বিচ্ছেদের আরও কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বামীর আদেশ না মানা, শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে বনিবনা না হওয়া, সামান্য বিষয়ে রেগে যাওয়া এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পরিবারের অন্য সদস্যদের অযাচিত হস্তক্ষেপ।

চলতি বছরের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান ডিসেম্বরের শেষে

সিরাজগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার শরীফ তোরাফ হোসেন বলেন, ২০২৫ সালে জেলায় ৪ হাজার ৮০৩টি তালাক নিবন্ধিত হয়েছে। চলতি বছরের পরিসংখ্যান ডিসেম্বরের শেষ দিনে পাওয়া যাবে।

তিনি বলেন, বিয়ে বিচ্ছেদের বিষয়ে তারা সব সময় উভয় পক্ষকে অনুৎসাহিত করেন।

এদিকে সিরাজগঞ্জ লিগ্যাল এইড অফিস দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক মামলা-মোকদ্দমা মীমাংসা বৈঠকের মাধ্যমে সমাধানের কাজ করছে। এর মাধ্যমে অনেক সংসার বিচ্ছেদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

লিগ্যাল এইড অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যৌতুক ও নারী সংক্রান্ত ৪৬১টি অভিযোগ সেখানে এসেছে। এর মধ্যে ৪৪৮টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে ৪৫৭ সংসার জোড়া লাগানো হয়েছে

সিরাজগঞ্জ লিগ্যাল এইড অফিসার (সিনিয়র সিভিল জজ) কাফি আল আজাদ বলেন, সংসার ভাঙা-গড়ার ক্ষেত্রে দুই পক্ষেরই কিছু দায় থাকে। পুরুষদের মধ্যে মাদকাসক্তি, জুয়া বা পরকীয়ায় আসক্তির কারণে স্ত্রী বাধ্য হয়ে তালাক দেন। স্ত্রীকে একাধিকবার মারধরের ঘটনা ঘটলেও সংসার টেকে না।

তিনি বলেন, স্বামী আয় না করলে বা স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে না পারলেও বিচ্ছেদ ঘটে। শিক্ষিত পরিবারে শারীরিক নির্যাতন না হলেও মানসিক নির্যাতনের কারণে একপর্যায়ে সংসার ভেঙে যায়। দুই পক্ষের পরিবারের অযাচিত হস্তক্ষেপও দাম্পত্য কলহের একপর্যায়ে বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

নারীদের দিক থেকে মোবাইল ফোনের আসক্তিকেও একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন কাফি আল আজাদ। তার ভাষ্য, অনেক স্বামী অভিযোগ করেন, স্ত্রী রাত ১টা-২টা পর্যন্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন এবং সকাল ৯টা-১০টায় ঘুম থেকে ওঠেন। এতে সংসারের দৈনন্দিন কাজ স্বাভাবিকভাবে করা সম্ভব হয় না।

তিনি আরও বলেন, কেউ কেউ টিকটক ও রিলসের মাধ্যমে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ছেন, স্বামীর আদেশ মানছেন না। অল্পতেই রেগে গিয়ে ঝগড়া থেকে বড় ধরনের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় এবং তা তালাকের দিকে গড়ায়।

কাফি আল আজাদ বলেন, লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ অভিযোগ আপস-মীমাংসায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। তা সংসার টিকিয়ে রাখার মাধ্যমে হোক কিংবা বিচ্ছেদের মাধ্যমে।

তিনি জানান, ২০২৫ সালে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে ভেঙে যাওয়া ৪৫৭টি সংসার জোড়া লাগানো সম্ভব হয়েছে। দুই পক্ষকে কাউন্সেলিং করে যার যার দায়িত্ব বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। উভয় পক্ষ বিষয়টি বুঝতে পারলে সংসার টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়।