কুড়িগ্রামের সদর উপজেলার কাঠালবাড়ি ইউনিয়নের খলিশা কালোয়া গ্রামে এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগকে ঘিরে সামনে এসেছে এমনই এক ভয়াবহ চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, একাধিক শিশুকে যৌন নির্যাতনের পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে বসানো হয় সালিশ। শুধু তাই নয়, মামলার বাদী ও তার প্রতিষ্ঠিত মানবিক সংগঠন এবং এতিমখানা উচ্ছেদের হুমকিসহ ভুক্তভোগীদের ওপর চালানো হয় নানা ধরনের অরাজকতা।
নার্সারিতে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ
জানা যায়, সবুজের ছায়াঘেরা এই গ্রামেই ‘আলোর সন্ধান’ নামে একটি সুশোভিত নার্সারি রয়েছে। (১৭ জুন) সেই নার্সারির ভেতরেই ১২ বছর বয়সী সুমাইয়া আক্তারকে আমের আঁটি ও টাকার প্রলোভন দেখিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে নার্সারির মালিক আবুল হাসানের বিরুদ্ধে।
সুমাইয়ার কান্না তখনো থামেনি। এরই মধ্যে টিম বাংলা এডিশনের হাতে আসে আবুল হাসানের লালসার শিকার আরও কয়েকজন শিশুর ভয়াবহ অভিযোগ। ফাতেমা, রুকাইয়া, আফিয়া, ইয়াসমিনসহ ১২ বছর বয়সী বা এর আশপাশের বেশ কিছু শিশু অভিযুক্ত আবুল হাসানের হিংস্র থাবার শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সালিশের মাধ্যমে রফাদফার চেষ্টা
অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়টির ভয়াবহতা এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে ন্যায়বিচারের বদলে শুরু হয় ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার অপচেষ্টা। সেই রাতেই স্থানীয় ফারুক মিয়ার বাড়িতে, ওই এলাকার মেম্বার আলতাফ হোসেন, গ্রামের চৌকিদার দুলাল মিয়া এবং শহিদুল ইসলাম নামের এক ব্যাক্তিসহ আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির উপস্থিতিতে বসানো হয় গোপন বৈঠক।
সেখানে, ১০ বছরের আফিয়া ও ১১ বছরের মুনতাহাকে হাজির করিয়ে মানসিক হয়রানির অভিযোগও ওঠে এলাকার সেই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে।
মর্জিনা বেগম। ভুক্তভোগী ফাতেমা আক্তারের দাদী।
স্থানীয় যুবকদের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও বিচার-সালিশের মাধ্যমে আপস ও মীমাংসার চেষ্টা করা হলে অভিযুক্তের বাড়ি ঘেরাও করে যুবকরা। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে আবুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পরবর্তীতে শরিফুল বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে থানায় মামলা করেন। তবুও, মানবিকতার টানে নিজেই আসামির জামিনের চেষ্টা করেন বলে জানান শরিফুল। কিন্তু জামিনের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরই পরিস্থিতি বদলে যায়।
বাদীর ওপর হয়রানি ও হুমকি
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত আবুল হোসেন পরবর্তীতে জামিনে বেরিয়ে আসলে, শরিফুলের ওপর শুরু হয় নানা ধরনের হয়রানি। রাতের আঁধারে তার বাড়ির গ্লাস ভাঙচুর, প্রাণনাশের হুমকি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ প্রচারণা—কিছুই বাদ যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে আবুল হোসেনসহ স্থানীয় সেই প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে।
এমনকি শরিফুলকে চাপে ফেলতে তার চরের দরিদ্র শিশুদের জন্য গড়ে তোলা দুটি এতিমখানা ও মাদ্রাসা উচ্ছেদের ষড়যন্ত্রের অভিযোগও উঠে আসে।
অপরদিকে অভিযুক্ত আবুল হোসেনের দাবি, তিনি শিশুদের স্পর্শ করলেও, তাতে কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে ছিলো না।
আইনি এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন
অন্যদিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন কিংবা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী—ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধের বিচার করার কোনো আইনি এখতিয়ার স্থানীয় ইউপি সদস্য বা গ্রাম চৌকিদারের নেই।
এ ধরনের যৌন হয়রানির বিচার যেখানে আদালতের কাঠগড়ায় হওয়ার কথা, সেখানে জনপ্রতিনিধি কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালীরা নিজেদের মতো করে এ ধরনের অপরাধের রফাদফা কোন এখতিয়ারে করলেন—সেটাই এখন সময়ের বড় প্রশ্ন।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাওয়া হয় মেম্বার আলতাফ হোসেনের কাছে। কিন্তু তার দাবি, তিনি নাকি সালিশের শেষদিকে সেখানে গিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত আবুল হোসেনের বক্তব্য ভিন্ন। তার দাবি, সালিশের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মেম্বার আলতাফ হোসেনের উপস্থিতিতেই শিশুকে যৌন নিপীড়নের মামলার রফাদফার প্রক্রিয়া চলে।
মামলার তদন্ত অগ্রগতি
এদিকে, মামলার অগ্রগতির বিষয়ে কুড়িগ্রাম সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কামাল হোসেন জানান, মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়া হয়েছে। এছাড়াও আবুল হোসেনের পৈশাচিকতার প্রাথমিক সত্যতার প্রসঙ্গও উঠে আসে তার বক্তব্যে।
একটি শিশুর শৈশব কেড়ে নেয়া শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়—এটি পুরো সমাজের বিবেকের ওপর আঘাত। আর এমন নৃশংসতার আঘাত যেন ভবিষ্যতে কোনো শিশুর ওপর নেমে না আসে, সেজন্য অভিযুক্তকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি স্থানীয়দের।
আরও পড়ুন:







