সোমবার

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩০ ভাদ্র, ১৪৩৩

চুল কাটতে বের হওয়া রায়হান ফিরল এক পা ও কিডনি হারিয়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:৫৯

শেয়ার

চুল কাটতে বের হওয়া রায়হান ফিরল এক পা ও কিডনি হারিয়ে
ছবি সংগৃহীত

মাত্র ১০০ টাকা নিয়ে চুল কাটতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১২ বছরের শিশু মোহাম্মদ রায়হান। সাত মাস পর বাড়ি ফিরেছে সে। তবে ফিরেছে ডান পা হারিয়ে। পেটের ডান পাশ ও পিঠে রয়েছে অস্ত্রোপচারের দীর্ঘ দাগ। পরিবারের সন্দেহ, ঢাকার একটি অপরাধ চক্র তাকে পঙ্গু করে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার পাশাপাশি তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে বিক্রি করেছে।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার অটোরিকশাচালক নাজিম উদ্দীনের ছেলে রায়হান। সাত মাস আগে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর গত ১৩ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে চুনতি সীরাত মাহফিল এলাকায় এক পায়ে ভর দিয়ে ভিক্ষা করার সময় স্থানীয়রা তাকে চিনতে পারেন। পরে খবর পেয়ে বাবা সেখানে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন।

রায়হান জানায়, চুল কাটার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে সে কক্সবাজার যায়। সেখানে কয়েকজন ছেলের সঙ্গে পরিচয়ের পর তাদের সঙ্গে ট্রেনের ছাদে চড়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে যায়। সেখান থেকে কয়েকজন লোক তাকে চারপাশে বাগান ও মাঝখানে একটি ঘর রয়েছে এমন একটি জায়গায় নিয়ে যায়। সেখানে তার মতো আরও অনেক ছেলে-মেয়ে ছিল।

রায়হানের ভাষ্য, এক রাতে সেখানে ঘুমানোর পর সকালে উঠে সে দেখতে পায় তার একটি পা নেই। কারণ জানতে চাইলে তাকে বলা হয়, সে ট্রেন দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে। এরপর প্রতিদিন তাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে ভিক্ষা করানো হতো এবং ভিক্ষার টাকা একটি প্লাস্টিকের ব্যাংকে জমা রাখা হতো। সেখানে দুইজন পুরুষ ও সালমা নামের এক নারী ছিল। অনেকেরই হাত-পা কাটা ছিল বলেও জানায় সে। একপর্যায়ে তাকে বাসে তুলে দিলে সে চুনতি মাহফিল এলাকায় চলে আসে।

রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দীন বলেন, রায়হান হেফজখানায় পড়ত। একটু দুষ্টুমি করত বলে তাকে পানের ক্ষেতে কাজে নিয়ে যেতেন। ১০০ টাকা দিয়ে চুল কাটতে পাঠানোর পর সে কক্সবাজার চলে যায়। পরে কমলাপুরে নিয়ে গিয়ে তার এক পা কেটে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানো হয় বলে ছেলের কাছ থেকে জানতে পারেন। মাহফিলে এক ব্যক্তি রায়হানকে দেখে খবর দিলে সেখানে গিয়ে ছেলেকে দেখে দুজন জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন। অভাবের কারণে নিখোঁজ হওয়ার পর তিনি জিডি করতে পারেননি বলেও জানান।

থানায় অভিযোগ না নেওয়ার দাবি বাবার

নাজিম উদ্দীন অভিযোগ করেন, রায়হান ফিরে আসার পর তার কাছ থেকে ঘটনা জানতে পেরে লোহাগাড়া থানায় অভিযোগ করতে গেলে পুলিশ তা নেয়নি। ঘটনাটি কমলাপুরের হওয়ায় সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ করতে বলা হয়। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ হিসেবে ঢাকায় গিয়ে অভিযোগ করার সামর্থ্য তার নেই বলেও জানান তিনি।

রায়হানের সৎমা ফয়জুন্নেসা বলেন, চুল কাটতে গিয়ে সাত মাস বাড়ি ফেরেনি ছেলে। এখন ফিরে এলেও তার একটি পা নেই এবং পেটে বড় কাটার দাগ রয়েছে। এই ঘটনার জন্য সরকারের কাছে কঠিন বিচার দাবি করেন তিনি।

সীরাত মাহফিলে রায়হানকে প্রথম দেখতে পাওয়া স্থানীয় বাসিন্দা নুরুন্নবী বলেন, রাত ১২টার পর মাহফিলের ভিড়ে এক পায়ে ভর দিয়ে একটি ছোট ছেলেকে ভিক্ষা করতে দেখেন তিনি। মুখ চেনা মনে হওয়ায় কাছে গিয়ে নাম জিজ্ঞেস করলে শিশুটি কান্নার মধ্যে নিজেকে নাজিম মিয়ার ছেলে রায়হান বলে পরিচয় দেয়। পরে তার বাবাকে ফোন করে খবর দেওয়া হয়।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. তৈয়ুবুল্লাহ বলেন, নাজিম উদ্দীন একজন সাধারণ অটোরিকশাচালক এবং তার পরিবার অত্যন্ত নিরপরাধ। তার ১২ বছরের সন্তানের সঙ্গে যে বর্বরতা করা হয়েছে, তা মানুষের কল্পনার বাইরে। অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।

মানবাধিকার কর্মী দেলোয়ার হোসেন রশিদী বলেন, শিশুটিকে দেখে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছেন। রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি চক্র তার জীবন শেষ করে দিয়েছে। তিনি ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সরকার ও প্রশাসনের কাছে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানান।

পুলিশের বক্তব্য, পরিবার আগে কোনো জিডি করেনি

থানায় আইনি সহায়তা না দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ও পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক জানান, রায়হান সাত মাস আগে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেও তার পরিবার থানায় কোনো অভিযোগ বা জিডি করেনি।

পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক বলেন, পরিবার জানিয়েছে, রায়হান কক্সবাজারে এক মাস ছিল। পরে সেখান থেকে তাকে কমলাপুরে নেওয়া হয়েছিল। এ কারণে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে রায়হান নিখোঁজ থাকার সময়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর তার একটি ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। ওই ভিডিওতে রায়হানকে বলতে দেখা যায়, জায়গা সংক্রান্ত মামলায় তার বাবা কারাগারে এবং সৎমা তাকে মারধর করায় সে ট্রেনের ছাদে চড়ে ঢাকায় চলে এসেছে। তবে স্বজনদের দাবি, ভয় বা কারও শেখানো কথায় শিশুটি এমন বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারে।

নিখোঁজ শিশুদের নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনের উদ্বেগ

মানবাধিকার আইনজীবী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআএফ) মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, বাংলাদেশে গত সাত মাসে প্রায় ১৪ হাজার শিশু এভাবে নিখোঁজ হয়েছে। তাদের ধারণা, একটি চক্র শিশুদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কর্তনের পর তা কাজে লাগাচ্ছে। এ বিষয়ে রাষ্ট্রকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বিএইচআএফ জানায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশু উদ্ধার হলেও ২ হাজার ৩৮ শিশু এখনও নিখোঁজ। নিখোঁজ শিশুদের সিংহভাগের বয়স ১০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।

বিএইচআএফের চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, নিখোঁজ প্রতিটি শিশুর ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিশু পাচার, অঙ্গ পাচার ও ভিক্ষা চক্রের সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। মুন এলার্টের মতো জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা দেশব্যাপী কার্যকর করা এবং নিখোঁজ শিশুদের জন্য সমন্বিত জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করা রাষ্ট্রের জরুরি দায়িত্ব বলেও জানান তিনি।