শনিবার

১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৮ ভাদ্র, ১৪৩৩

তিতাসের বুকে নৌকা বাইচে চ্যাম্পিয়ন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর

মোছাব্বির হাসান সজীব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২১:৪৯

শেয়ার

তিতাসের বুকে নৌকা বাইচে চ্যাম্পিয়ন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর
ছবি বাংলা এডিশন

বৈঠার ছন্দ, ঢাক-ঢোলের তালে আর হাজারো দর্শকের উচ্ছ্বাসে শনিবার উৎসবমুখর হয়ে উঠেছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদী। আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা-২০২৬ ঘিরে নদীর দুই তীরে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা নৌকা দল।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তিতাস নদীতে এ নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে মানুষ নদীর দুই তীরে জড়ো হতে থাকেন। দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দর্শনার্থীদের ভিড় রূপ নেয় জনসমুদ্রে।

জেলার নয়টি উপজেলা থেকে প্রতিযোগী দল নৌকা নিয়ে এ বাইচে অংশ নেয়। প্রতিযোগিতা শুরু হলে তিতাসের বুকে শুরু হয় নৌকার তীব্র লড়াই। দ্রুতগতিতে ছুটে চলা নৌকাগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে দর্শকদের উচ্ছ্বাস।

কখনো করতালি, কখনো চিৎকার-উল্লাস, আবার কোথাও ঢাক-ঢোলের তালে পুরো নদীপাড় পরিণত হয় উৎসবের মঞ্চে। প্রতিযোগী নৌকাগুলো গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের উত্তেজনাও বাড়তে থাকে।

শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী ও বয়োজ্যেষ্ঠ সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে তিতাসের দুই তীর পরিণত হয় বিশাল এক মিলনমেলায়।

দিনব্যাপী প্রতিযোগিতা শেষে প্রথম স্থান অর্জন করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা নৌকা দল। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জন করে আরও দুটি প্রতিযোগী দল।

বিজয়ী দলকে ২ লাখ টাকা, দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দলকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলকে ১ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়। পরে অতিথিরা বিজয়ী দলগুলোর হাতে ট্রফি ও পুরস্কারের অর্থ তুলে দেন।

সদর উপজেলা নৌকা দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে দর্শক ও সমর্থকদের মধ্যে আনন্দের ঢেউ ওঠে। বিজয়ী দলের সদস্যদের উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম, পুলিশ সুপার শাহ মো. আব্দুর রউফ, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নাদিয়া পাঠান পাপন, জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি জহিরুল হক খোকন, আলী আজম, হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি, মোবারক হোসেন ও আসাদুজ্জামান শাহীন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর প্রশাসক শরিফুল ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ের ব্যক্তিরা।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. আবছার।

নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে তিতাস নদী ও নদীর দুই তীরে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নদী ও তীরবর্তী এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। সম্ভাব্য দুর্ঘটনা মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদেরও প্রস্তুত রাখা হয়।

প্রতিযোগিতা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে জেলা বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও সার্বিক সহযোগিতা করেন। পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, সামাজিক সংগঠন ‘ঢেউ’সহ বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।

আয়োজকদের মতে, নৌকা বাইচ আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামীণ অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও নৌকা বাইচের মতো আয়োজন নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তিতাসের বুকে নৌকার দুরন্ত গতি, বৈঠার ছন্দ আর হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাসে দিনভর মুখর ছিল নদীর দুই পাড়। সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিল উৎসবের আমেজ। চ্যাম্পিয়ন সদর উপজেলার বিজয় ও দর্শকদের প্রাণভরা উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা-২০২৬।