শনিবার

১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৮ ভাদ্র, ১৪৩৩

‎মেঘনার ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে সরাইলের চার গ্রাম

আতিকুল ইসলাম, সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৪:৩৪

শেয়ার

‎মেঘনার ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে সরাইলের চার গ্রাম
ছবি: বাংলা এডিশন

একসময় যেখানে ছিল বসতবাড়ি, পুকুর, ফসলের মাঠ আর কর্মচঞ্চল চাতাল, সেখানেই এখন মেঘনা নদীর বিস্তৃত জলরাশি। বছরের পর বছর নদীর ভাঙনে পালপাড়া, পানিশ্বর, শাখাইতি ও শোরবাড়ি গ্রামের চিত্র বদলে গেছে। একের পর এক বসতভিটা, কৃষিজমি ও স্থাপনা নদীতে হারিয়ে এখন টিকে থাকার লড়াই করছেন এসব গ্রামের বাসিন্দারা।

‎চলতি বছরও নতুন করে নদীর তীর ভাঙতে শুরু করায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে। পানিশ্বর ইউনিয়নের মেঘনাতীরবর্তী চার গ্রামে প্রায় ১ থেকে দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙনের চিহ্ন দেখা দিয়েছে। এতে নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী অর্ধশতাধিক পরিবার ঘরবাড়ি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন।

‎স্থানীয়দের ভাষ্য, চার দশক ধরে চলা ভাঙনে গ্রামের বিশাল একটি অংশ ইতোমধ্যে নদীর পেটে চলে গেছে। গত এক দশকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে স্থানীয় চাতালশিল্প। গত চার বছরে শুধু শোরবাড়ির ১০টি, পানিশ্বরের পাঁচটি ও শাখাইতির ১৪টি চাতাল নদীতে বিলীন হয়েছে। চাতালগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন সহস্রাধিক শ্রমিক।

‎নদীর আগ্রাসনে এ সময়ের মধ্যে চার গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবার স্থায়ীভাবে বসতভিটা হারিয়েছে। আরও শতাধিক পরিবার কোনো না কোনোভাবে ভাঙনের ক্ষতির শিকার হয়েছে। বর্তমানে নতুন করে তীর ভাঙতে থাকায় সামনে আরও বড় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

‎পালপাড়া গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা ধীরেন্দ্র পাল বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। কিন্তু নদীভাঙনের স্মৃতি এখনও স্পষ্ট তাঁর মনে। তিনি বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষদের সময় তিন কানি জায়গাজুড়ে বসতবাড়ি ছিল। নদীর ভাঙনে সেই জায়গা কমতে কমতে এখন মাত্র তিন শতকে এসে ঠেকেছে।

‎আক্ষেপ করে ধীরেন্দ্র পাল বলেন, ‘বাবা-জেঠাদের আমলে আমাদের বসতবাড়ি ছিল তিন কানি। এখন আছে মাত্র তিন শতক। যেভাবে ভাঙতেছে, মনে অয় জন্মভিটায় মরতেও ফারুম না।’

‎তিনি জানান, পালপাড়া গ্রামের মাঝখানে একসময় ১৭ কানির একটি বড় পুকুর ছিল। পুকুর ঘিরে ছিল বাড়িঘর ও চাষের জমি। নদীভাঙনের ধারাবাহিকতায় সেসবের কোনো অস্তিত্ব এখন নেই।

‎তাঁর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৪০ থেকে ৪৫ বছরে নদীভাঙনের কারণে এ এলাকার ৫০০ থেকে ৬০০ পরিবার অন্যত্র চলে গেছে। বর্তমানে গ্রামে ৩০ থেকে ৩৫টি পরিবার টিকে আছে। দ্রুত প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা না হলে তাদেরও একই পরিণতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

‎শাখাইতি গ্রামের বাসিন্দা ওসমান গণি চৌধুরী ও সাবেক ইউপি সদস্য মোস্তফা মিয়ার ভাষ্য, সাম্প্রতিক কয়েক বছরে ভাঙনের ভয়াবহতা বেড়েছে। তাঁদের মতে, তিন-চার বছরের মধ্যেই ২৫ থেকে ৩০টি চাতালসহ একটি মসজিদ, মাজার, কবরস্থান, কৃষিজমি ও কয়েকটি বসতবাড়ি নদীতে চলে গেছে। বর্তমানে আরও কিছু বাড়ি ভাঙনের মুখে রয়েছে।

‎স্থানীয়রা বলছেন, এখনই নদীশাসনের কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। তাঁদের আশঙ্কা, ভাঙন অব্যাহত থাকলে পানিশ্বর বাজার, পানিশ্বর স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শাখাইতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং শোরবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও হুমকির মুখে পড়বে।

‎পানিশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তৌহিদ মিয়া বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন চললেও স্থায়ীভাবে তা বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকানোর পরিবর্তে চারটি গ্রামকে রক্ষায় একটি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এখন সবচেয়ে জরুরি।

‎এদিকে ভাঙন ঠেকাতে আপাতত জিও ব্যাগ ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, চারটি গ্রাম রক্ষায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ। এ বিষয়ে গত মার্চে পানিসম্পদমন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে।

‎রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল সেখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে দেয়া। এ জন্য গত মার্চে পানিসম্পদমন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার দিয়েছি। বাঁধ না হওয়া পর্যন্ত আমার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’

‎পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ব্রাহ্মণবাড়িয়া কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আকাশ দত্ত জানান, আপাতত ভাঙন ঠেকাতে পানিশ্বর এলাকায় ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৯ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে।

‎তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য পালপাড়া থেকে শোরবাড়ি পর্যন্ত ১ দশমিক ৩৫০ কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ নির্মাণের একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এর সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ কোটি টাকা। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পাওয়া গেলে আগামী শুষ্ক মৌসুমে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করার আশা করছে পাউবো।

‎তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন প্রস্তাব ও আশ্বাসের বাইরে কবে বাস্তবে বাঁধ নির্মাণ হবে? কারণ মেঘনার ভাঙন থেমে নেই। প্রতিদিন নদীর দিকে তাকিয়ে নিজেদের শেষ সম্বলটুকু রক্ষার অপেক্ষায় রয়েছেন চার গ্রামের মানুষ।