বৃহস্পতিবার

১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৬ ভাদ্র, ১৪৩৩

অভিনব কায়দায় অভিযুক্তের থেকে টাকা হাতিয়ে নিলেন দুই পুলিশ সদস্য!

বিবি মরিয়ম চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৪৫

শেয়ার

অভিনব কায়দায় অভিযুক্তের থেকে টাকা হাতিয়ে নিলেন দুই পুলিশ সদস্য!
ছবি সিসি ক্যামেরা থেকে নেওয়া

নগরের নিরাপত্তা যেখানে শেষ, অপরাধের নতুন অধ্যায় যেন শুরু ঠিক সেখান থেকেই। ডিবি পরিচয়ে উঠিয়ে নিয়ে খোদ পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের ভেতরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রফাদফা। নগদ টাকা, এটিএম বুথ থেকে ক্যাশ তুলে নেয়া আর বাইন্যান্সের লাখ লাখ ক্রিপ্টো ডলার হাতিয়ে নেয়ার এক দুর্ধর্ষ নেপথ্য কাহিনী।

ডিবি পরিচয়ে হানা

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকাল। চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের কে-ব্লকের ৩৬ নম্বর বাসা। সিভিল ড্রেসে হানা দেয় আটজনের এক অস্ত্রধারী দল। নিজেদের পরিচয় দেয় ডিবি পুলিশ হিসেবে। অনলাইন জুয়ার এজেন্টর অভিযোগে ওই বাসা থেকে আক্তারুজ্জামান শাকিল ও তার বন্ধু মোহাম্মদ মনসুরকে তুলে নেয়ার পাশাপাশি ঘরে থাকা ১৪টি দামি স্মার্টফোন এবং পার্কিংয়ে থাকা প্রাইভেটকারটিও জিম্মি করে তারা।

কিন্তু, অপারেশনটি কি শুধুই কোনো সাধারণ অভিযান ছিল? আর এই কথিত অভিযানের নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের এলআইসি শাখার সহকারী পুলিশ কমিশনার শরীফুল আলম চৌধুরী সুজন এবং এএসআই বাছির।

পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে জিম্মি

ভুক্তভোগীদের সোজা নিয়ে যাওয়া হয় চরম সুরক্ষিত পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে। দাবি করা হয় এক কোটি টাকা।

দীর্ঘ দেনদরবার শেষে চুক্তি হয় সাড়ে ১৩ হাজার ডলার ও নগদ ১০ লাখ টাকায়। এরপর ‘জরুরি ওষুধ সরবরাহ’ স্টিকার লাগানো মাইক্রোবাসে করে পাশের ‘কুটুমবাড়ি রেস্টুরেন্টে’খাবার খাওয়ানো হয় জিম্মিদের। এরপরই শুরু হয় নিখুঁত ডিজিটাল লুণ্ঠন।

ডিজিটাল লুণ্ঠন ও এটিএম থেকে টাকা তোলা

বাংলা এডিশনের হাতে আসা নথি বলছে, রাত ৯টা ৪৪ মিনিটে বাইন্যান্স অ্যাকাউন্ট থেকে প্রথম দফায় সরানো হয় এক হাজার ডলার। এরপর, ঠিক ৯টা ৫৩ মিনিটে তোলা হয় আরও ৫ হাজার ১৬৫ ডলার। রাত ১০টা ১৬ মিনিটে সিটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ৬ লাখ টাকা আবার ডলারে রূপান্তর করে গায়েব করা হয় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। লুটপাটের নাটক এখানেই শেষ হয়নি।

রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে পুলিশ কমিশনার কার্যালয় থেকে বেরিয়ে আসে শাকিলের প্রাইভেটকার। ড্রাইভিং সিটে খোদ এএসআই বাছির। গাড়ি গিয়ে থামে ব্র্যাক ব্যাংকের এটিএম বুথের সামনে। মাত্র ৬ মিনিটের ব্যবধানে পাঁচ দফায় তুলে নেয়া হয় আরও চার লাখ টাকা।

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) আবারো শাকিলসহ তার বন্ধুকে পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে উঠিয়ে নিয়ে, দাবি করা হয় আরো ৫ লাখ টাকা। বিনিময়ে ফেরত দেয়া হবে তার জব্দকৃত মালামাল।

নগ্ন ব্ল্যাকমেইল

টাকা ও ডলার হাতিয়ে নেয়ার পরও ভুক্তভোগীর মোবাইল থেকে গোপনে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও সরিয়ে নেন এসি সুজন। এরপরই নতুন করে শুরু হয় নগ্ন ব্ল্যাকমেইলিং।

পরে, অবশ্য কিছুটা নমনীয় হয়ে এসি শরীফুল আলম চৌধুরী সুজন একটি আইফোন দাবি করেন। শাকিলের ব্যক্তিগত নাম্বার ও মুঠোফোন এখন ব্যবহার করছেন এসি সুজন। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাত ১টা ৫ মিনিটে তিনি ওই নাম্বার থেকে শাকিলের সাথে যোগাযোগ করেন।

পুলিশের অস্বীকার

প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত এলআইসি শাখায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট ট্র্যাপ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত এএসআই বাছিরের মুখোমুখি হয় টিম বাংলা এডিশন। যাবতীয় তথ্য ও প্রমাণের পাহাড় সামনে রাখার পরও আটকের বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন তিনি। দায় ঠেলে দেন সহকারী পুলিশ কমিশনারের ঘাড়ে।

আর অন্যদিকে বারবার চেষ্টা করেও মেলেনি সহকারী পুলিশ কমিশনার শরীফুল আলম চৌধুরী সুজনের হদিস।

তবে, পুলিশের একটি সূত্র জানায়, আক্তারুজ্জামান শাকিল অনলাইন জুয়ার এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন এবং তার বাইন্যান্স অ্যাকাউন্টে বিপুল অর্থ রয়েছে, এমন তথ্যের ভিত্তিতেই মূলত এই অভিযান চালানো হয়েছিল।

কিন্তু, সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এবং মামলায় গ্রেপ্তার না দেখিয়ে খোদ পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে এনে, এভাবে টাকা আদায় করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অপরাধ দমনের পোশাক পরে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির ক্ষমতার এই চরম অপব্যবহার আর জিম্মি বাণিজ্যের জবাব এখন কে দেবে? পুলিশের আড়ালে গড়ে ওঠা এই অন্ধকার চক্রের বিচার চায় ভুক্তভোগীরা।