শনিবার

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১ আশ্বিন, ১৪৩৩

মেঘনার ভাঙনে লক্ষ্মীপুরের ২০ কিলোমিটার এলাকা, ঝুঁকিতে শত শত পরিবার

প্রকাশিত: ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২০:০৬

শেয়ার

মেঘনার ভাঙনে লক্ষ্মীপুরের ২০ কিলোমিটার এলাকা, ঝুঁকিতে শত শত পরিবার
ছবি: বাংলা এডিশন

মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর, সদর ও রামগতি উপজেলার বয়ারচর এলাকার প্রায় ২০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা ভাঙনকবলিত হয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় এখনো কোনো ধরনের স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় নদীর তীরবর্তী শত শত পরিবার রয়েছেন চরম ঝুঁকিতে। কোথাও নদী ভাঙছে বসতভিটা, কোথাও ফসলি জমি ও চলাচলের রাস্তা। ভাঙন অব্যাহত থাকলে আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

রায়পুর উপজেলার উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের চর ঝালিয়া ও চর ঘাশিয়া গ্রামেও দেখা দিয়েছে নদীভাঙনের ভয়াবহতা। সাজু মোল্লা ঘাট এলাকার চর ঝালিয়া গ্রামে নদীর তীর ঘেঁষে বসতবাড়িগুলো রয়েছে ঝুঁকির মধ্যে। গ্রামের ভেতরের চলাচলের একটি রাস্তার এক পাশও ভাঙনের কবলে পড়েছে। রাস্তার পাশে নদীর পানি চলে আসায় স্থানীয়দের চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়রা জানান, চর ঝালিয়া এলাকায় একসময় মেঘনা নদীর একটি ছোট খাল ছিল। ওই খাল পার হয়ে তারা চলাচল করতেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ভাঙতে ভাঙতে খালটি ক্রমেই প্রশস্ত হতে থাকে। বর্তমানে এটি বিশাল আকার ধারণ করে মেঘনা নদীর সঙ্গে মিশে গেছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

চর ঝালিয়া গ্রামে প্রায় ১০০ পরিবার বসবাস করে। সেখানে রয়েছে একটি মসজিদও। ভাঙন অব্যাহত থাকায় বসতভিটা ও মসজিদ নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয়রা।

একই ইউনিয়নের চর ঘাশিয়া গ্রামেও চলছে নদীভাঙন। স্থানীয়দের ভাষ্য, গ্রামের চান্দার খাল একসময় ছোট একটি জলপথ ছিল। ভাঙতে ভাঙতে সেটি এখন বিশাল মেঘনা নদীতে পরিণত হয়েছে। নদীর তীরবর্তী বসতভিটা, কৃষিজমি ও চলাচলের রাস্তা রয়েছে ঝুঁকির মধ্যে।

চর ঘাশিয়া গ্রামে রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির নতুন ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। বিদ্যালয় থেকে মেঘনা নদীর দূরত্ব এখন মাত্র আধা কিলোমিটার। ভাঙন অব্যাহত থাকলে নদী ধীরে ধীরে বিদ্যালয়ের দিকে এগিয়ে আসতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের। গ্রামটিতে আরও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে।

চর ঝালিয়ার বাসিন্দা মকুল মাঝি বলেন, আগে এখানে ছোট একটি খাল ছিল। আমরা চেক দিয়ে খাল পার হতাম। এখন ভাঙতে ভাঙতে সেই খাল বড় হয়ে গেছে। কয়েকটি বসতভিটা নদীতে চলে গেছে। এভাবে ভাঙতে থাকলে আমাদের গ্রামও একসময় নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।

রাসেল ছৈয়াল বলেন, চোখের সামনে বাড়িঘর ও জমি নদীতে চলে যাচ্ছে। কখন নিজের বাড়িটাও নদীতে চলে যায়, সেই আতঙ্কে থাকি। দ্রুত ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

চর ঘাশিয়ার বাসিন্দা সিদ্দিক বলেন, চান্দার খাল আগে এত বড় ছিল না। ধীরে ধীরে ভাঙতে ভাঙতে এখন বিশাল মেঘনা নদীতে পরিণত হয়েছে। নদী প্রতিনিয়ত আমাদের গ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে।

মফিজ বলেন, রাস্তার পাশ ভেঙে যাচ্ছে। এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে গ্রামের মানুষের চলাচলের পথও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। দ্রুত নদীর তীর রক্ষায় ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

কুদ্দুস বলেন, আমাদের গ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। স্কুল থেকে নদী এখন মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে। ভাঙন বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে বিদ্যালয়টিও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

স্থানীয় নারী বাসিন্দা কুলসুমা বেগম বলেন, নদী আমাদের বাড়ির খুব কাছে চলে এসেছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে সবসময় ভয় লাগে। কখন বাড়ি ভেঙে নদীতে চলে যায়, সেই চিন্তায় থাকি। আমরা চাই দ্রুত নদীভাঙন বন্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক।

রামগতির বয়ারচরের বাসিন্দা লিটন গাইন বলেন, মেঘনা নদীর ভাঙনে আমাদের এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। অনেক জায়গায় নদীর তীরের কোনো সুরক্ষা নেই। প্রতিদিনই নতুন নতুন জায়গায় ভাঙন দেখা দিচ্ছে। এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে বসতভিটা, ফসলি জমি ও মানুষের জীবিকা হারিয়ে যাবে। বয়ারচরকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে দ্রুত ব্লক স্থাপনসহ স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।

রামগতি উপজেলার বাসিন্দা সুফিয়ান মাঝি বলেন, মেঘনার ভাঙন আমাদের এলাকার মানুষের জন্য দীর্ঘদিনের আতঙ্ক। নতুন বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ায় আমরা আশার আলো দেখছি। বাঁধের কাজ দ্রুত শেষ হলে নদীভাঙন থেকে অনেক পরিবার ও ফসলি জমি রক্ষা পাবে।

কমলনগর উপজেলার বাসিন্দা [নাম] বলেন, নদীভাঙনে আমাদের এলাকার অনেক মানুষ ঘরবাড়ি ও জমি হারিয়েছেন। এখন যে বাঁধের কাজ চলছে, সেটি ভালোভাবে ও টেকসইভাবে সম্পন্ন করা দরকার। বাঁধের কাজ শেষ হলে মেঘনার ভাঙন থেকে উপকূলীয় মানুষের অনেকটাই স্বস্তি মিলবে।

নদীভাঙন প্রতিরোধে চলমান ও সম্পন্ন কাজ সম্পর্কে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী গোকুল চন্দ্র পাল বলেন, লক্ষ্মীপুরের প্রায় ৬০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা ভাঙনপ্রবণ। এর মধ্যে ২০১৮ সালে ৬ দশমিক ৫০০ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধের কাজ হয়েছে।

তিনি জানান, রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় বর্তমানে ৩১ কিলোমিটার বাঁধের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া ৬২০ মিটার এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে কাজ করা হয়েছে। তবে রায়পুর, লক্ষ্মীপুর সদর ও রামগতির বয়ারচরসহ প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকা এখনো ভাঙনকবলিত অবস্থায় রয়েছে, যেখানে কোনো ধরনের সুরক্ষা নেই।

গোকুল চন্দ্র পাল বলেন, এসব এলাকায় নদীভাঙন প্রতিরোধে ব্লক দেওয়ার জন্য দুটি পৃথক প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। বয়ারচরের প্রকল্পটি বর্তমানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে যাচাই-বাছাই সভার মধ্যে রয়েছে। আশা করছি, সামনে একনেকে উঠলে বয়ারচরের প্রকল্পটি অনুমোদন পাবে। আর সদর ও রায়পুরের এই অংশের জন্যও একটি প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে।

এদিকে রামগতি ও কমলনগর উপজেলার মেঘনা তীরবর্তী এলাকায় নতুন বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। বাঁধের ঢালু অংশে কংক্রিটের ব্লক বসিয়ে নদীর তীর রক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, রায়পুর, সদর ও বয়ারচরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতেও দ্রুত একই ধরনের টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের দাবি, মেঘনার ভাঙন ঠেকাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০ কিলোমিটার ভাঙনকবলিত এলাকার ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়বে। বসতভিটা, কৃষিজমি, রাস্তা, মসজিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রক্ষায় দ্রুত ব্লক স্থাপনসহ স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণকাজ শুরুর দাবি জানিয়েছেন তারা।