চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে অ্যাপেন্ডিসাইটের অস্ত্রোপচারের পর সোহাগী খাতুন নামে অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসায় অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার কারণেই প্রাণ হারিয়েছেন মেধাবী এই শিক্ষার্থীর। গত রবিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পরিবারের দাবি, জীবননগরের মনোয়ারা সনো সেন্টার অ্যান্ড নার্সিং হোমে তার অস্ত্রোপচার করেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক ডা. রফিকুল ইসলাম।
পরিবার ও ঘটনার বিবরণ
সোহাগী জীবননগর উপজেলার হাসাদাহ ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামের মোমিনুর রহমান মন্ডলের মেয়ে। স্থানীয় বিসিকেএমপি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী ছিলেন তিনি।
পরিবারের দাবি, ২৭ আগস্ট অসুস্থ অবস্থায় সোহাগীকে ক্লিনিকে নেয়া হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অ্যাপেন্ডিসাইট শনাক্ত হওয়ার কথা জানান ডা. রফিকুল ইসলাম। পরদিন তার অস্ত্রোপচার করা হয়। ৩০ আগস্ট বাড়ি ফেরার পর শুরু হয় প্রচণ্ড বমি ও মাথাব্যথা। অবস্থার অবনতি হলে ২ সেপ্টেম্বর তাকে আবারও ওই ক্লিনিকে নেয়া হয়।
মা ও খালার অভিযোগ
সোহাগীর মায়ের অভিযোগ, ক্লিনিকে নেয়ার পর চিকিৎসক প্রথমে তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন এবং চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে অন্যত্র নিয়ে যেতে বলেন। পরে আবার তাকে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হয়। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ওষুধের পাশাপাশি ঘুমের ইনজেকশন দেয়া হয়। একই অভিযোগ করেন সোহাগীর খালা নাসিমা খাতুন। তার দাবি, ইনজেকশন দেয়ার পর আর জ্ঞান ফেরেনি সোহাগীর।
পরদিনও জ্ঞান না ফেরায় ডা. রফিকুল ইসলাম সোহাগীকে যশোরের কুইন্স হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন বলে জানায় পরিবারের সদস্যরা। সেখানে তার খিচুনি শুরু হলে চিকিৎসকরা ঢাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেয়। পরে দ্রুত আইসিইউতে ভর্তি করা হয় তাকে। ঢাকায় নেয়ার প্রায় আধা ঘণ্টা পরই মৃত্যু হয় সোহাগীর।
রিপোর্ট নিয়ে পরিবারের দাবি
পরিবারের দাবি, যে রিপোর্টের ভিত্তিতে অ্যাপেন্ডিসাইটের কথা বলে অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল, সেটি ঢাকার চিকিৎসকদের দেখানো হলে তারা জানায়, ওই রিপোর্ট অনুযায়ী অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন ছিল না।
অপচিকিৎসা ও চিকিৎসক-নার্সদের অবহেলার কারণেই সোহাগীর মৃত্যু হয়েছে, এমন অভিযোগ পরিবারের। এ ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় এনে সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়েছে তারা।
ক্লিনিকের নার্সদের বক্তব্য
তবে, পরিবারের অভিযোগের সঙ্গে ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন ক্লিনিকের নার্সরা। তাদের দাবি, সোহাগীর অ্যাপেন্ডিসাইটের চিকিৎসা হয়েছিল। পরে বমি ও প্রচণ্ড মাথাব্যথা নিয়ে আবার ক্লিনিকে এলে তখন ডা. রফিকুল ইসলাম সেখানে ছিলেন না। রিমি নামে আরেক চিকিৎসক তাকে দেখেন এবং বমি ও ঘুমের ইনজেকশন দেন বলে জানায় তারা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মনোয়ারা সনো সেন্টার অ্যান্ড নার্সিং হোমের মালিক ও চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
সিভিল সার্জনের বক্তব্য
চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়াউদ্দীন আহমেদ জানান, এ ঘটনায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ তারা পায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত কমিটি গঠন করে ক্লিনিকে গিয়ে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে, ডা. রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সমর্থক চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের আজীবন সদস্য, এমন তথ্য পাওয়া গেছে। ৫ আগস্টের আগে জীবননগর সরকারি হাসপাতালে বদলি-বাণিজ্য পরিচালনা এবং দলীয় প্রভাব খাটিয়ে ফ্যাসিস্ট আমলে বর্তমান ক্লিনিকটি প্রতিষ্ঠার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ নিয়ে সে সময় স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন:







