শনিবার

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১ আশ্বিন, ১৪৩৩

গাজীপুরে কেয়া গ্রুপে ছাঁটাই, অনিশ্চয়তায় ৬২৭ শ্রমিক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮:০৯

শেয়ার

গাজীপুরে কেয়া গ্রুপে ছাঁটাই, অনিশ্চয়তায় ৬২৭ শ্রমিক
ছবি সংগৃহীত

গাজীপুরের কোনাবাড়ীর জরুন এলাকায় কেয়া গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠানের ৬২৭ জন শ্রমিক ও কর্মচারীকে ছাঁটাই করেছে কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘদিন ধরে কারখানাগুলো লে-অফ অবস্থায় থাকার পর এই সিদ্ধান্তে চাকরি হারানো শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও আর্থিক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

ছাঁটাই করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো কেয়া নিট কম্পোজিট ডিভিশন, স্পিনিং ডিভিশন, কটন ডিভিশন এবং কেয়া ইয়ার্ন মিলস লিমিটেড।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় কারখানার প্রধান ফটকে ছাঁটাই করা শ্রমিক-কর্মচারীদের নামের তালিকা সাঁটিয়ে দেওয়া হয়। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে তালিকায় নাম থাকা শ্রমিক-কর্মচারীরা কারখানার প্রধান ফটকে ভিড় করেন। এ সময় অনেকে তালিকায় নিজের নাম খুঁজছিলেন এবং সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। হঠাৎ চাকরি হারানোর ঘটনায় অনেকের মধ্যে উদ্বেগ ও চাপা ক্ষোভ দেখা যায়।

ব্যাংকিং জটিলতা ও গ্যাস সংকটের কারণ দেখিয়েছে কর্তৃপক্ষ

কারখানা কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের স্বাক্ষরিত নোটিশে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং জটিলতা, গ্যাস বিল পরিশোধ করতে না পারায় গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত জনবলের কারণে উৎপাদন ও প্রশাসনিক ব্যয় কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বিভিন্ন সেকশন, বিভাগ ও ডিভিশনের কিছু পদ বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নোটিশে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২০ অনুযায়ী কারখানার অতিরিক্ত শ্রমিক ও কর্মচারীদের ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ছাঁটাই করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক-কর্মচারীদের আইন অনুযায়ী প্রাপ্য পাওনাদি পরিশোধ করা হবে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে কারখানায় নতুন করে শ্রমিক-কর্মচারী নিয়োগের প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২১ অনুযায়ী ছাঁটাই হওয়া দক্ষ শ্রমিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হবে। সংকটকালে কারখানার পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখার জন্য শ্রমিক-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতাও কামনা করা হয়েছে।

লে-অফে থাকা কর্মীরাও পাবেন আইন অনুযায়ী সুবিধা

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যেসব শ্রমিক ও কর্মচারীর চাকরি বহাল রয়েছে, তারাও লে-অফ নোটিশের আওতায় থাকবেন। তারা আইন অনুযায়ী লে-অফের সময় প্রাপ্য সুবিধা বা বেনিফিট পাবেন। ছাঁটাই প্রক্রিয়ার আওতায় থাকা শ্রমিক-কর্মচারীদের নাম ও পদবির তালিকাও নোটিশের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে।

কেয়া গ্রুপের মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক সাবিনা ইয়াসমিন জানান, ছাঁটাই করা শ্রমিক-কর্মচারীদের ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে শ্রম আইন অনুযায়ী সব পাওনাদি পরিশোধ করা হবে।

গাজীপুর শিল্প পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, কেয়া গ্রুপ কর্তৃপক্ষ কিছু শ্রমিককে ছাঁটাইয়ের নোটিশ দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কারখানার প্রধান ফটকে শিল্প পুলিশের পাশাপাশি জিএমপি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

জুন থেকে লে-অফ, একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে মেয়াদ

কারখানা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই কেয়া গ্রুপের কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রমে স্থবিরতা চলছে। গত ৬ জুন ২০২৬ থেকে ব্যাংকিং জটিলতা এবং গ্যাস বিল পরিশোধ করতে না পারায় গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণ দেখিয়ে কারখানাটিতে লে-অফ ঘোষণা করা হয়। পরে সেই লে-অফের মেয়াদ একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

দীর্ঘ সময় কারখানা বন্ধ বা লে-অফ অবস্থায় থাকার পর ৬২৭ শ্রমিক-কর্মচারীকে ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তারা নতুন করে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত ছিলেন। চাকরি হারানোর ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে চলবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।

দ্রুত পাওনাদি পরিশোধ ও পুনর্বহালের দাবি শ্রমিকদের

শ্রমিকদের কয়েকজন জানান, দীর্ঘদিন ধরে কারখানা লে-অফ থাকায় তারা আর্থিক সংকটে রয়েছেন। এর মধ্যে ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত তাদের সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আইন অনুযায়ী পাওনাদি দ্রুত পরিশোধ এবং ভবিষ্যতে কারখানা চালু হলে দক্ষ শ্রমিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন তারা।

মঙ্গলবার সকালে কারখানার প্রধান ফটকে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের ভিড় থাকলেও বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কারখানা এলাকায় শিল্প পুলিশ ও গাজীপুর মহানগর পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

কারখানা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, বর্তমান আর্থিক ও উৎপাদন পরিস্থিতিতে ব্যয় কমানো এবং প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই জনবল কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংকট কাটিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন করে শ্রমিক নিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।