মঙ্গলবার

৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৪ ভাদ্র, ১৪৩৩

জীবননগরে মনোয়ারা সনো সেন্টারে ভুল অপারেশন ও অপচিকিৎসায় কিশোরী মৃত্যুর অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৫:১৩

শেয়ার

জীবননগরে মনোয়ারা সনো সেন্টারে ভুল অপারেশন ও অপচিকিৎসায় কিশোরী মৃত্যুর অভিযোগ
ছবি: সংগৃহীত

চিকিৎসা সেবা যেখানে মানুষের জীবন বাঁচানোর একমাত্র ভরসাস্থল, সেখানে কিছু অসাধু চিকিৎসকের অবহেলা ও লোভ মানুষের জীবন কেড়ে নেয়ার ফাঁদে পরিণত হয়েছে। চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় এমনই এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। মনোয়ারা সনো সেন্টার অ্যান্ড নার্সিং হোমে ভুল অপারেশন ও অপচিকিৎসার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে বিসিকেএমপি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী ১৪ বছরের কিশোরী সোহাগী খাতুন। যার হাসিখুশি জীবন নিভে গেছে চিকিৎসকদের চরম দায়িত্বহীনতার কারণে।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ আগস্ট পেটে ব্যথা নিয়ে সোহাগীকে জীবননগরের মনোয়ারা সনো সেন্টারে ভর্তি করা হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডা. রফিকুল ইসলাম দাবি করেন তার অ্যাপেন্ডিসাইট হয়েছে এবং দ্রুত অপারেশন করাতে হবে। কথা মতো পরদিনই তার অপারেশন করা হয়। কিন্তু অপারেশনের পর থেকেই শুরু হয় দুঃস্বপ্ন। ৩০ আগস্ট তাকে বাড়ি পাঠানো হলেও প্রচণ্ড বমি, মাথাব্যথা ও জ্বরে তার অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। গত ২ সেপ্টেম্বর তাকে পুনরায় ওই ক্লিনিকে আনা হলে শুরু হয় চিকিৎসকদের চরম টালবাহানা ও অমানবিক আচরণ।

এবিষয়ে সোহাগীর মা, লাভলী খাতুন বলেন "ডা. রফিকুল ইসলাম নিজে অপারেশন করার পর আমার মেয়ের অবস্থা খারাপ করে ফেলে। পরে যখন আবার নিয়ে গেলাম, তখন প্রথমে তিনি আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন এবং চিকিৎসা দিতে চাননি। পরে আবার নিজেই ডেকে এনে ওষুধ ও ঘুমের ইনজেকশন দেন। ওই ইনজেকশন দেওয়ার পর থেকেই আমার মেয়ের আর জ্ঞান ফেরেনি!"

এরপর অবস্থা আরও অবনতি হলে তড়িঘড়ি করে তাকে প্রথমে যশোরের কুইন্স হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে ঢাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে আইসিইউতে নেয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আইসিইউতে নেওয়ার মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যেই না ফেরার দেশে চলে যায় ছোট্ট সোহাগী। পরিবারের অভিযোগ, ঢাকায় নেওয়ার পর চিকিৎসকরা আগের সেই পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে স্পষ্ট জানিয়েছেন—ওই সময় সোহাগীর শরীরে অপারেশন করার মতো কোনো জটিলতাই ছিল না! অথচ ভুল রিপোর্ট আর টাকার লোভে অপ্রয়োজনীয় অপারেশন করে তার জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

তবে সোহাগীর খালা, নাসিমা খাতুন বলেন: "ওই ক্লিনিকের ডাক্তার, নার্স ও স্টাফদের আচরণ ছিল অত্যন্ত পশুর মতো। আমাদের সামনে রোগীর সাথে গালিগালাজ করা হয়েছে। আমরা স্পষ্ট বলছি, এটি কোনো চিকিৎসা নয়, এটি সরাসরি হত্যা বা অপচিকিৎসা। আমরা এর বিচার চাই।"

অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযুক্ত ডা. রফিকুল ইসলাম একজন সহকারী অধ্যাপক হওয়া সত্ত্বেও নিয়মবহির্ভূতভাবে দীর্ঘদিন ধরে ক্লিনিকে সিজারিয়ানসহ বিভিন্ন বড় ধরনের অপারেশন চালিয়ে আসছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি সচরাচর ঢাকায় থাকেন এছাড়াও সাচিবের আজীবন সদস্য তিনি। কেবল সপ্তাহের বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার জীবননগরে এসে নিজ প্রতিষ্ঠান মনোয়ারা সনো সেন্টারে চেম্বার ও অপারেশন করেন। নজরদারির অভাবে এ ক্লিনিকে এমন অপচিকিৎসার ঘটনা ঘটলেও স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছে।

ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলামের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এদিকে চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

টাকার লোভে আর ডাক্তারের অবহেলায় এভাবে আর কত মায়ের বুক খালি হবে? জীবননগরের এই মনোয়ারা সনো সেন্টারের অপচিকিৎসার বিরুদ্ধে যদি দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে এমন মর্মান্তিক পরিণতি হয়তো আরও অনেককে বরণ করতে হবে। প্রশাসন দ্রুত এই চিকিৎসকের লাইসেন্স বাতিল করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করুক—এটাই এখন এলাকাবাসীর একমাত্র দাবি।