তুলনামূলক কম দাম, সহজলভ্যতা ও পুষ্টিগুণের কারণে দেশে ব্যাপকভাবে খাওয়া হয় পেয়ারা। এই ফল উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। তবে রাজশাহী বিভাগের বাণিজ্যিক বাগান থেকে সংগ্রহ করা কিছু পেয়ারায় অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি আর্সেনিক, সিসা ও ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকেরা।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাণিজ্যিক বাগান থেকে সংগ্রহ করা পেয়ারার ৯০ শতাংশ নমুনায় ক্যাডমিয়ামের মাত্রা অনুমোদিত সীমার বেশি। প্রায় ৭০ শতাংশ নমুনায় অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি সিসা এবং ৩০ শতাংশ নমুনায় আর্সেনিকের মাত্রা নির্ধারিত সীমার ওপরে পাওয়া গেছে।
দেশের চার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা রাজশাহী বিভাগের আট জেলার ১০টি এলাকায় বাড়ির বাগান ও বাণিজ্যিক বাগান থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করে এ গবেষণা করেন। গবেষণাটি গত আগস্টে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিসে প্রকাশিত হয়েছে।
চার ভারী ধাতুর উপস্থিতি
গবেষণায় আর্সেনিক, সিসা, ক্যাডমিয়াম ও তামা—এই চার ভারী ধাতুর উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, চারটি ধাতুর ঘনত্বই বাড়ির বাগানের তুলনায় বাণিজ্যিক বাগানের পেয়ারায় বেশি।
বাণিজ্যিক বাগানের পেয়ারায় আর্সেনিকের সর্বোচ্চ ঘনত্ব পাওয়া গেছে প্রতি কেজিতে ৩ দশমিক ৮৪ মিলিগ্রাম। খাদ্য নিরাপত্তার অনুমোদিত সীমা অনুযায়ী, পেয়ারায় আর্সেনিকের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা প্রতি কেজিতে ১ মিলিগ্রাম। বাণিজ্যিক বাগানের ৩০ শতাংশ নমুনায় আর্সেনিকের মাত্রা এই সীমা ছাড়িয়েছে। তবে বাড়ির বাগানের সব নমুনায় আর্সেনিকের মাত্রা অনুমোদিত সীমার মধ্যে ছিল।
সিসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ঘনত্ব পাওয়া গেছে প্রতি কেজিতে ২ দশমিক ০৫ মিলিগ্রাম। অনুমোদিত সীমা প্রতি কেজিতে দশমিক ১ মিলিগ্রাম। বাণিজ্যিক বাগানের প্রায় ৭০ শতাংশ নমুনায় সিসার মাত্রা এই সীমার ওপরে ছিল। অন্যদিকে, বাড়ির বাগানের সব পেয়ারায় সিসার মাত্রা অনুমোদিত সীমার মধ্যে পাওয়া গেছে।
ক্যাডমিয়ামের ফলাফল আরও উদ্বেগজনক। বাণিজ্যিক বাগানের ৯০ শতাংশ নমুনায় এর মাত্রা অনুমোদিত সীমার বেশি পাওয়া গেছে। সর্বোচ্চ মাত্রা ছিল প্রতি কেজিতে ১ দশমিক ৮৮ মিলিগ্রাম, যেখানে অনুমোদিত সীমা দশমিক শূন্য ৫ মিলিগ্রাম। বাড়ির বাগানের ২০ শতাংশ পেয়ারায়ও ক্যাডমিয়ামের মাত্রা অনুমোদিত সীমার বেশি ছিল।
তামার ক্ষেত্রেও বাণিজ্যিক পেয়ারায় বেশি মাত্রা পাওয়া গেছে। সর্বোচ্চ ঘনত্ব ছিল প্রতি কেজিতে ৯ দশমিক ০৪ মিলিগ্রাম। বাণিজ্যিক বাগানের প্রায় অর্ধেক নমুনায় তামার মাত্রা অনুমোদিত সীমা ৪ দশমিক ৫ মিলিগ্রামের ওপরে ছিল। বাড়ির বাগানের সব নমুনায় তামার মাত্রা অনুমোদিত সীমার মধ্যে ছিল।
শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি
গবেষণায় পেয়ারায় ভারী ধাতুর উপস্থিতির পাশাপাশি এসব পেয়ারা খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের শরীরে কী পরিমাণ ভারী ধাতু প্রবেশ করতে পারে এবং এতে কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে, সেটিও মূল্যায়ন করা হয়েছে।
গবেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার নির্ধারিত পদ্ধতি ব্যবহার করে ঝুঁকি মূল্যায়ন করেন। এতে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের শরীরের ওজন, দৈনিক পেয়ারা খাওয়ার পরিমাণ এবং পেয়ারায় ভারী ধাতুর ঘনত্ব বিবেচনায় নেওয়া হয়।
গবেষণার ফল অনুযায়ী, শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায় সব নমুনাতেই সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গবেষকেরা বলছেন, শিশুদের শরীরের ওজন কম হওয়ায় একই পরিমাণ দূষিত খাবার গ্রহণ করলে শরীরের ওজনের অনুপাতে দূষকের গ্রহণমাত্রা বেশি হয়। ফলে ভারী ধাতুদূষিত খাবারের ক্ষেত্রে শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকে।
দূষণের উৎস চিহ্নিত হয়নি
পেয়ারায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেলেও এসব ধাতু ঠিক কোন উৎস থেকে এসেছে, তা এই গবেষণায় নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়নি। গবেষণাপত্রেও এ সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যে জমি থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করা হয়েছে, সেই জমির মাটি বা সেচের পানিতে ভারী ধাতুর মাত্রা সরাসরি পরীক্ষা করেননি গবেষকেরা।
গবেষকদের মতে, দীর্ঘদিন রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটিতে ভারী ধাতু জমতে পারে। দূষিত ভূগর্ভস্থ বা উপরিভাগের পানি দিয়ে সেচ দেওয়ার মাধ্যমেও এসব ধাতু ফসলে প্রবেশ করতে পারে। শিল্পকারখানার নির্গমন ও যানবাহনের ধোঁয়া থেকেও বাতাসের মাধ্যমে মাটিতে ভারী ধাতু জমার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২৫ সালে রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও জয়পুরহাট—এই আট জেলা থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করা হয়। বগুড়া ও সিরাজগঞ্জে দুটি করে এবং অন্য ছয় জেলায় একটি করে এলাকা থেকে নমুনা নেওয়া হয়।
প্রতিটি এলাকায় পাশাপাশি একটি বাড়ির বাগান ও একটি বাণিজ্যিক বাগান নির্বাচন করা হয়। দুই ধরনের বাগানের দূরত্ব ছিল প্রায় এক কিলোমিটার। প্রতিটি নির্বাচিত গাছ থেকে পরিপক্ব তিনটি পেয়ারা সংগ্রহ করা হয়। পরে গবেষণাগারে এসব নমুনায় আর্সেনিক, সিসা, ক্যাডমিয়াম ও তামার মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। ভারী ধাতু শনাক্ত করতে প্লাজমাভিত্তিক আলোক নিঃসরণ বর্ণালিবীক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
আরও নজরদারির পরামর্শ গবেষকদের
গবেষণার নেতৃত্ব দেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পুষ্টি ও খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের প্রভাষক মো. সাখাওয়াত হোসেন। তাঁর সঙ্গে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির আরও ছয় গবেষক যুক্ত ছিলেন।
মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আট মাস ধরে গবেষণার কাজ চলে। নমুনাগুলো যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। খাদ্যে ক্ষতিকর ভারী ধাতুর অনুপ্রবেশ কীভাবে কমানো যায়, তা নিশ্চিত করাই ছিল গবেষণার উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, কৃষক পর্যায়ে বিষয়টি নজরদারির জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকেরা কী ধরনের কীটনাশক কতটা ব্যবহার করছেন এবং সেগুলোর মান কেমন, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিমালা ও মাঠ পর্যায়ে তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন।
গবেষকেরা মনে করেন, বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে খাওয়া হয় এমন ফলগুলোতে ভারী ধাতুদূষণ নিয়ে নিয়মিত নজরদারি থাকা দরকার। বিশেষ করে বাণিজ্যিক বাগানের ক্ষেত্রে মাটি, সেচের পানি, সার ও কীটনাশকের মান পরীক্ষা জরুরি।
আতঙ্ক নয়, নিরাপদ কৃষিচর্চায় জোর
গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এই গবেষণার ফল রাজশাহী বিভাগের ১০টি এলাকার নমুনার ওপর ভিত্তি করে পাওয়া। তাই দেশের সব বাণিজ্যিক বাগানের পেয়ারা একই মাত্রায় দূষিত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
তবে ফলের নিরাপত্তা নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা, নিয়মিত নজরদারি এবং কৃষি পর্যায়ে নিরাপদ চর্চা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। গবেষকদের মতে, সঠিক নিয়ম ও পরিমাণে কীটনাশক, সার ও সেচের পানি ব্যবহারসহ উত্তম কৃষিচর্চা অনুসরণ করা গেলে খাদ্যপণ্যে ভারী ধাতুর দূষণ কমানো এবং নিরাপদ ফসল উৎপাদন সম্ভব।
আরও পড়ুন:

.jpg)





