শনিবার

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১ আশ্বিন, ১৪৩৩

সীমান্তে মানব পাচার ঠেকাতে নজরদারি বাড়িয়েছে বিজিবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:২৬

শেয়ার

সীমান্তে মানব পাচার ঠেকাতে নজরদারি বাড়িয়েছে বিজিবি
ছবি সংগৃহীত

পঞ্চগড় সীমান্তে গত ১০ দিনে পৃথক তিন অভিযানে চার রোহিঙ্গাসহ ১০ জনকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এসব ঘটনায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজনকে এনে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে সীমান্ত পার করে ভারতে পাচারের চেষ্টা করা সংঘবদ্ধ চক্রের তৎপরতার তথ্য সামনে এসেছে।

আটকদের মধ্যে কেউ কক্সবাজার, কেউ ফেনী, কেউ সুনামগঞ্জ এবং কেউ পঞ্চগড়ের বাসিন্দা। চাকরি, ভালো আয়ের প্রলোভন কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনকে কাজে লাগিয়ে দালালদের মাধ্যমে তাঁদের সীমান্ত এলাকায় আনা হয় বলে জানা গেছে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সীমান্তে

সাম্প্রতিক অভিযানে আটক ছয় বাংলাদেশির বাড়ি কক্সবাজার, ফেনী, সুনামগঞ্জ ও পঞ্চগড় জেলায়। তাঁদের ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যও ছিল ভিন্ন। কেউ চাকরির সন্ধানে, কেউ স্পা সেন্টারে কাজের জন্য, আবার কেউ বিয়ে করে অন্য নারীকে নিয়ে দেশ ছাড়ার উদ্দেশ্যে ভারতে যাচ্ছিলেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় থাকা দালালরা প্রথমে এসব ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁদের সীমান্তবর্তী এলাকায় আনা হয়। সেখানে দায়িত্ব নেয় স্থানীয় পাচারকারী চক্র। অর্থাৎ দেশের এক প্রান্ত থেকে লোক সংগ্রহ করে সীমান্তে পৌঁছে দেওয়ার পর স্থানীয় সদস্যরা তাঁদের সীমান্ত পার করার চেষ্টা করেন।

২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় সীমান্ত পার

মানব পাচারের সময় আটক সঞ্জিদ কুমার রায় (২৩) জানান, স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সীমান্ত এলাকায় এসেছিলেন তিনি।

সঞ্জিদের ভাষ্য অনুযায়ী, নারায়ণ নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে ভারতে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। চক্রের সদস্যদের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁরা সীমান্তের দিকে যাচ্ছিলেন। তবে সীমান্ত অতিক্রমের আগেই বিজিবির হাতে আটক হন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অবৈধভাবে ভারতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সাধারণত একজনের কাছ থেকে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়। তবে ব্যক্তি ও পরিস্থিতি অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

কয়েক স্তরে কাজ করে সংঘবদ্ধ চক্র

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মানব পাচারকারী চক্রটি কয়েকটি স্তরে কাজ করে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় থাকা সদস্যরা চাকরি, ভালো আয়ের সুযোগ কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধানের প্রলোভন দেখিয়ে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তাঁদের সীমান্ত এলাকায় নিয়ে আসা হয়।

সীমান্তে পৌঁছানোর পর স্থানীয় পাচারকারীরা তাঁদের দায়িত্ব নেয়। একটি পাচারের ঘটনায় ১০ থেকে ১২ জন পর্যন্ত সদস্য বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত থাকতে পারে বলে জানা গেছে।

চক্রের কেউ সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে, কেউ পাচারের শিকার ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে আসে। আবার কেউ সীমান্তের ওপারে থাকা সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। সীমান্তের দুই পাশের সদস্যদের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সুযোগ বুঝে রাতের আঁধারে পাচারের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

পঞ্চগড়ের কয়েকটি সীমান্ত এলাকায় বিস্তীর্ণ চা-বাগান থাকায় পাচারের কাজে ওই পরিবেশও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পঞ্চগড় সীমান্ত কেন পাচারকারীদের পছন্দ

বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চগড়ের সীমান্তবর্তী কয়েকটি এলাকার বিপরীতে ভারতের উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেল যোগাযোগ রয়েছে। সীমান্ত পার হওয়ার পর দ্রুত অন্য এলাকায় চলে যাওয়ার সুযোগ থাকায় পাচারকারীদের কাছে এসব রুট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

পঞ্চগড়ের সীমান্তবর্তী এলাকার কাছাকাছি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জ ব্লকের বিভিন্ন এলাকা রয়েছে। এসব এলাকা উত্তরবঙ্গের সড়ক যোগাযোগ ও রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। ফলে সীমান্ত পার হওয়ার পর দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত এলাকার কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন ধরনের সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধে জড়িত। মানব পাচারের ঘটনায় বিজিবির করা মামলাতেও একাধিক ব্যক্তির নাম এসেছে।

পুলিশ-বিজিবির সমন্বিত অভিযান

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ফরহাদ হোসেন বলেন, মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যদের ধরতে পঞ্চগড় জেলা পুলিশ, পঞ্চগড় সদর থানা-পুলিশ, ডিবি ও সিআইডি সমন্বিতভাবে কাজ করছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে। বিষয়টি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সকেও জানানো হয়েছে এবং জেলা পুলিশ আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে।

৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাইফুর হাসান মাহমুদ বলেন, বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিযান চালিয়ে পাচারের সঙ্গে জড়িতদের আটক করা হচ্ছে। সীমান্তে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।