একসময় যেখানে ছিল শুধু চর, কাশবন আর পরিত্যক্ত অনাবাদি জমি, বর্তমানে সেখানেই সূর্যের আলো থেকে তৈরি হচ্ছে বিদ্যুৎ। গ্যাস, তেল কিংবা কয়লা ছাড়াই প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে লাখ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ। যমুনার পশ্চিম তীরে গড়ে ওঠা সিরাজগঞ্জ ৬৮ মেগাওয়াট সোলার পার্ক তাই এখন শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; অনাবাদি জমিকে কাজে লাগিয়ে সবুজ জ্বালানির নতুন সম্ভাবনারও উদাহরণ।
সিরাজগঞ্জে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদে, যমুনা সেতুর পশ্চিম পাড়ে নদীর তীর ঘেঁষে ২১৪ একর অনাবাদি জমিতে গড়ে উঠেছে অত্যাধুনিক এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত প্রকল্পটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায় রবিবার (১৪ জুলাই)। বর্তমানে কেন্দ্রটি জাতীয় গ্রিডে ৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। এরই মধ্যে দুই লাখ মেগাওয়াট-আওয়ারেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে তৈরি করেছে নতুন দৃষ্টান্ত।
একসময় অবহেলিত জনপদ হিসেবে পরিচিত যমুনাপাড়ের এই অঞ্চল যমুনা সেতু নির্মাণের পর ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা এই সোলার পার্ক, সেই পরিবর্তনেরই আরেকটি অধ্যায়। অনাবাদি জমিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে বিদ্যুতের জোগান বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের মধ্যেও তৈরি হয়েছে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন প্রত্যাশা।
প্যানেল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা
পুরো প্রকল্পজুড়ে স্থাপন করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৫৭৬টি অত্যাধুনিক মনোক্রিস্টালাইন বাইফেসিয়াল সোলার প্যানেল। সূর্যের আলো শোষণ করে এসব প্যানেল ডিসি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। পরে, ৭২টি ইনভার্টারের মাধ্যমে তা এসি বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়। ১২টি ইনভার্টার স্টেশন ও ১০০ এমভিএ ক্ষমতার মেইন ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে ভোল্টেজ বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ট্রান্সমিশন লাইনে জাতীয় গ্রিডে পৌঁছে দেয়া হয় উৎপাদিত বিদ্যুৎ। অর্থাৎ জীবাশ্ম জ্বালানি ছাড়াই সূর্যের আলো থেকে তৈরি বিদ্যুৎ পৌঁছে যাচ্ছে জাতীয় সঞ্চালন ব্যবস্থায়।
পরিবেশ সুরক্ষায় অবদান
বিদ্যুতের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষাতেও সুফল মিলছে এই প্রকল্প থেকে। উৎপাদন শুরুর পর থেকে প্রায় এক লাখ ৪৩ হাজার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানো সম্ভব হয়েছে। এতে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়ও অবদান রাখছে এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র।
জমির বহুমুখী ব্যবহার
আরও একটি দিক থেকে ব্যতিক্রমী এই প্রকল্প। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি একই জমির বহুমুখী ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে এখানে। বর্ষা শেষে সোলার প্যানেলের নিচে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা হচ্ছে শীতকালীন সবজি। পাশাপাশি পালন করা হচ্ছে গবাদিপশুও। ফলে একসময় পড়ে থাকা অনাবাদি জমিতে এখন একইসঙ্গে তৈরি হচ্ছে বিদ্যুৎ, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদনের সুযোগ।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সিরাজগঞ্জের এই উদ্যোগের সফলতার ধারাবাহিকতায় যমুনাপাড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির আরও বড় পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সোলার পার্কের পাশের অনাবাদি জমিতে ৩৫ মেগাওয়াট এবং ক্রসবার-৩ বাঁধ এলাকায় প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার নতুন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে যমুনাপাড়েই প্রায় ৪৩৫ মেগাওয়াট পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
জ্বালানির বৈশ্বিক সংকটের সময়ে সূর্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার পথ খুঁজছে বাংলাদেশ। আর যমুনার তীরে সিরাজগঞ্জ ৬৮ মেগাওয়াট সোলার পার্ক দেখাচ্ছে সেই সম্ভাবনার বাস্তব রূপ। একসময় যে জমি ছিল অনাবাদি, সঠিক পরিকল্পনায় সেই জমিই এখন হয়ে উঠেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি ও প্রাণিসম্পদের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে যমুনাপাড়ে তৈরি হচ্ছে সবুজ জ্বালানির নতুন অধ্যায়।
আরও পড়ুন:







