সোমবার

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৫ আশ্বিন, ১৪৩৩

দুর্ঘটনার আড়ালে পরিকল্পিত হত্যা

শেখ বেলাল, হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:৩৮

শেয়ার

দুর্ঘটনার আড়ালে পরিকল্পিত হত্যা
ছবি: সংগৃহীত

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে আলোচিত সড়ক দুর্ঘটনার নেপথ্যে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের তথ্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে হাইওয়ে পুলিশ। পুলিশের অনুসন্ধান অনুযায়ী, দাম্পত্য বিরোধের জেরে শিক্ষক মাসুক পারভেজকে তাঁর সাবেক শ্বশুরবাড়িতে ডেকে নেয়ার পর পিছু নিয়ে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনাটিকে প্রথমে সড়ক দুর্ঘটনা মনে হলেও তদন্তে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এ ঘটনায় নিহত মাসুক পারভেজের সঙ্গে থাকা অফিস সহায়ক শামীম আহমেদও গুরুতর আহত হয়ে পরে মারা যান। শামীমের মৃত্যুতে তাঁর পরিবারে চলছে আহাজারি। নির্দোষ ছেলেকে হারিয়ে বিচার দাবি করছেন স্বজনরা।

ঘটনার অনুসন্ধানে পুলিশ জানতে পারে, প্রায় চার মাস আগে মাসুক পারভেজকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর সাবেক স্ত্রী আমিনা বেগম হ্যাপীকে এই পরিকল্পনার মূলহোতা এবং তাঁর ছোট ভাই সিরাজুল ইসলামকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হিসেবে সন্দেহ করছে পুলিশ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ আগস্ট সকালে আমিনা বেগম তাঁর বড় মেয়ে মিতি বেগমকে ফোন করে বাবাকে নতুন কাপড়, জুতা ও একটি ছাতা নিয়ে আসতে বলতে বলেন। মায়ের কথামতো মিতি তাঁর বাবা মাসুক পারভেজকে ফোন করলে তিনি ওই দিন দুপুরে মোটরসাইকেলে করে নবীগঞ্জ থেকে সাবেক শ্বশুরবাড়ি পানিউদা গ্রামে যান।

সেখানে মেয়ের সঙ্গে দেখা করে ফেরার সময় তাঁর পিছু নেন সাবেক শ্যালক সিরাজুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় চার কিলোমিটার দূরে সদরঘাট নতুন বাজার এলাকায় একটি নম্বরবিহীন ডিআই পিকআপ দিয়ে মাসুকের মোটরসাইকেলে পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দেয়া হয়।

ধাক্কায় মাসুক সড়কে ছিটকে পড়লে পিকআপটি আবার তাঁর ওপর দিয়ে উঠিয়ে দেয়া হয় বলে অভিযোগ। পরে গাড়িটি পাশের একটি মাটির ঢিবিতে গিয়ে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলে গুরুতর আহত হন মাসুক পারভেজ। তাঁর সঙ্গে থাকা অফিস সহায়ক শামীম আহমেদও গুরুতর আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও মারা যান।

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, প্রায় ১২ বছর আগে আমিনা বেগমের সঙ্গে মাসুক পারভেজের বিয়ে হয়। তাঁদের দুই কন্যাসন্তান রয়েছে। দাম্পত্য কলহের কারণে প্রায় পাঁচ বছর ধরে আমিনা দুই মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে বসবাস করছিলেন।

এ নিয়ে চার বছর ধরে যৌতুকসহ বিভিন্ন বিষয়ে চারটি মামলা চলছিল বলে জানা গেছে। সম্প্রতি একটি যৌতুক মামলায় মাসুক পারভেজের পক্ষে রায় হয়। একই সঙ্গে আদালত মাসে একবার তাঁকে দুই মেয়ের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এই রায়ের পর থেকেই বিরোধ আরও তীব্র হয় বলে অভিযোগ। আর এর জেরেই মাসুককে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে তদন্তে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

তদন্তে আরও জানা যায়, ঘটনার প্রায় দুই মাস আগে স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশনবিহীন একটি ডিআই পিকআপ ভ্যান কেনেন অভিযুক্ত সিরাজুল ইসলাম। ঘটনার দিন পানিউদা বাজার থেকে ওই গাড়ি নিয়ে তিনি মাসুকের মোটরসাইকেলের পিছু নেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের পর সিরাজুল পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে স্থানীয়রা তাঁকে আটক করে।

নিহত শামীম আহমেদের বাবা ইসমত মিয়া বলেন, তাঁর ছেলে সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিলেন। তিনি শুধু বন্ধু মাসুক পারভেজের সঙ্গে শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে তাঁকেও ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তিনি এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।

শামীমের মা করুণা বেগম বলেন, তাঁর ছেলে বাড়িতে ফিরে ভাত খাওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু আর বাড়ি ফেরা হয়নি তাঁর। ছেলেকে কেন এভাবে হত্যা করা হলো এর বিচার চান তিনি।

গোল্ডবাভ আব্দুল মান্নান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামাল উদ্দিন বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাসুক পারভেজ ও অফিস সহায়ক শামীম আহমেদ মোটরসাইকেলে করে যাওয়ার সময় এই মর্মান্তিক ঘটনার শিকার হন। তিনি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।

প্রত্যক্ষদর্শী বাউল শামীম ও স্থানীয় যুবক আরিয়ান হাসান জানান, পিকআপটি পেছন থেকে মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দেয়ার পরও গাড়িটি থামেনি। বরং সড়কে পড়ে থাকা ব্যক্তির ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেয়া হয় বলে তাঁরা দেখতে পান। ঘটনাটি দেখে তাঁরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

শেরপুর হাইওয়ে পুলিশের ওসি আনিসুর রহমান বলেন, ঘটনাটি নিয়ে পাঁচ দিন ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্লু পাওয়া গেছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে একজন চালক তাঁর বোনের জামাইকে পিকআপ দিয়ে চাপা দিয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। রেজিস্ট্রেশনবিহীন গাড়ি দিয়ে কীভাবে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে, তা তদন্ত করা হচ্ছে। হত্যা মামলা গ্রহণের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে।

সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে শুরু হওয়া এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত যদি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রমাণিত হয়, তাহলে এর পেছনের পরিকল্পনাকারী ও সহযোগীদের আইনের আওতায় আনা এখন সবচেয়ে বড় দাবি নিহত দুই পরিবারের।