গাজীপুরে মাদক কারবারের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে টঙ্গীর বিভিন্ন বস্তি। হাজীর মাজার, ব্যাংক মাঠ, কেরানীরটেক ও এরশাদ নগরসহ এসব এলাকায় প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার মাদক বেচাকেনা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এই কারবারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছেন কয়েকজন নারী। তাঁদের সহায়তায় কাজ করছেন আরও শতাধিক নারী।
টঙ্গীর মোমেলা বেগম, ময়না খাতুন, আফরিনা আক্তার, কুলসুম ও কারিমা বেগমের পাশাপাশি গাজীপুর মহানগরীর লক্ষ্মীপুরার তাহমিনা ও আশা এবং কাশিমপুরের ডালিয়া বেগম মাদক কারবার করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মোমেলা বেগমের বিরুদ্ধে ১৯টি মাদক মামলা
টঙ্গীর ব্যাংক মাঠ বস্তির মোমেলা বেগম (৪৬) বড় পাইকারি মাদক কারবারিদের একজন। গাঁজা দিয়ে কারবার শুরু করে পরে ফেনসিডিল, হেরোইন ও ইয়াবার ব্যবসায় জড়ান তিনি। টেকনাফ থেকে সরাসরি ইয়াবা আনার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ১৯টি মাদক মামলা রয়েছে।
পুলিশের শীর্ষ মাদক কারবারিদের তালিকায় থাকা মোমেলা প্রায় দেড় যুগের কারবারে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। টঙ্গীর মরকুনের কুদ্দুস খলিফা সড়কে জাহিদ হাসান ভিলা নামে বহুতল বাড়ি, শিলমুন পূর্বপাড়ায় প্রায় অর্ধকোটি টাকা মূল্যের আরেকটি বাড়ি এবং পুবাইলের করমতলা পূর্বপাড়ায় পৌনে চার কাঠা জমিতে আধাপাকা বাড়ি রয়েছে তাঁর। ব্যাংক মাঠ বস্তিতেও রয়েছে একাধিক ঘর।
স্বামী জাহাঙ্গীর আলমকে চারটি মিনিট্রাক ও সিএনজি অটোরিকশা এবং মেয়েজামাই পুলিশের সোর্স হৃদয়কে ২০ লাখ টাকা মূল্যের প্রাইভেট কার কিনে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। টঙ্গী ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় তাঁর নামে-বেনামে আরও কয়েক কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত বছরের ২ নভেম্বর ৪০০ ইয়াবা ও ৪০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হন মোমেলা।
পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ময়নার মাদক কারবার
ব্যাংক মাঠ বস্তির ময়না খাতুন (৫৫) এক ডজন মামলার আসামি। তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত মহিলা আওয়ামী লীগের স্থানীয় ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের যুগ্ম আহ্বায়ক। তাঁর মেয়ে নার্গিস ও পুত্রবধূ রোজীর নামও শীর্ষ মাদক কারবারির তালিকায় রয়েছে।
ময়নার ভাই শফিকুল ইসলাম টেকনাফ থেকে ইয়াবার চালান আনতে গিয়ে ছয় হাজার ইয়াবাসহ কক্সবাজার পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। দুই বছর কারাভোগের পর জামিনে বেরিয়ে আবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে বিপুল ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন তিনি।
ময়নার কাছ থেকে পাইকারি মাদক কিনে খুচরা বিক্রি করেন রানী (৪০) ও তাঁর ছেলে রাব্বানি (২৫)। ময়নার ছেলে তাজুল ইসলাম তাজুও মাদক ডিলার এবং তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।
ময়না ও তাজুল মাদকের টাকায় গাজীপুর ও মাদারীপুরে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। টঙ্গীর শিলমুন জাম্বুরেরটেকে তাজুল তাঁর শ্বশুর সোলেমান ফরাজির নামে ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ জমির ওপর একটি টিনশেড বাড়ি কিনেছেন। মাদারীপুরের শিবচরের হিন্দুপাড়ায় রয়েছে কয়েক বিঘা জমি। এসব সম্পত্তির বেশির ভাগ তাজুল তাঁর স্ত্রী রোজীর নামে কিনেছেন বলে জানা গেছে।
ফেনসিডিলের পর ইয়াবা বিক্রি করেন আফরিনা
টঙ্গীর ব্যাংক মাঠ বস্তির আফরিনা আক্তার (৪০) এলাকায় বড় আপা নামে পরিচিত। তিনি জামাল হোসেনের স্ত্রী। একসময় টঙ্গীর বড় পাইকারি ফেনসিডিল কারবারি থাকলেও বর্তমানে ইয়াবা বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মাদক কারবারে তাঁকে সহযোগিতা করেন স্বামী জামাল ও ভাই শ্রাবণ। মাদক কারবারে আফরিনাও কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কেরানীরটেকে কুলসুম ও কারিমার কারবার
টঙ্গীর কেরানীরটেক বস্তির শীর্ষ মাদক কারবারি কুলসুম (৩৫)। তাঁর মাদক কারবারে বিশাল বাহিনী রয়েছে বলে জানা গেছে। রেলওয়ের সরকারি জায়গা দখল করে কুলসুম ও তাঁর সহযোগীরা মাদক স্পট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর রয়েছে জমি, বাড়ি ও গাড়ি।
গত জুলাইয়ে আট কেজি গাঁজাসহ তাঁর বোন নার্গিসকে আটক করে টঙ্গী পূর্ব থানার পুলিশ। কুলসুমের অন্যতম সহযোগী তাঁর বোনের ছেলে রাকিব।
একই বস্তির আরেক শীর্ষ মাদক কারবারি কারিমা বেগম (৩৫)। গত ১৮ জুলাই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে এক ডজন মাদক মামলা রয়েছে। দীর্ঘদিনের মাদক কারবারে একাধিক বহুতল ভবনসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঝিয়ের কাজ থেকে পাঁচ বাড়ির মালিক ডালিয়া
গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর নয়াপাড়ার কাঁঠালতলা মহল্লার ডালিয়া (৩৮) ছয়-সাত বছর আগেও অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতেন। তাঁর স্বামী ওয়াশিম রিকশাভ্যান চালাতেন। বর্তমানে ওই এলাকায় তাঁদের পাঁচটি বাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে দুটি ছয়তলা এবং বাকিগুলো টিনশেড ভবন।
সব বস্তিতে পর্যায়ক্রমে অভিযান হবে
গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. বেলায়াত হোসেন জানান, মহানগরীর ছোট-বড় অনেক বস্তিতে মাদক কারবার চলে। এ কারবার বন্ধে গত আট মাসে অসংখ্য অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে বিপুল মাদকসহ ছোট-বড় অনেক কারবারিকে আটক করা হয়েছে।
তিনি জানান, কিছুদিন আগে বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। গত সোমবার রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সহায়তায় বস্তির মাদকের আস্তানাগুলো উচ্ছেদ করে সরকারি জমি উদ্ধার করা হয়েছে। টঙ্গীকে মাদকমুক্ত করতে পর্যায়ক্রমে সব বস্তিতে অভিযান চালানো হবে।
আরও পড়ুন:







