শনিবার

৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২১ ভাদ্র, ১৪৩৩

বান্দরবানে অধিগ্রহণ করা জমিতে মাছের ঘের, খাস জমিতে পরিবার পরিকল্পনা অফিস নির্মাণ

মো. নজরুল ইসলাম (টিটু), বান্দরবান প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৪:৩৯

শেয়ার

বান্দরবানে অধিগ্রহণ করা জমিতে মাছের ঘের, খাস জমিতে পরিবার পরিকল্পনা অফিস নির্মাণ
ছবি: বাংলা এডিশন

বান্দরবান সদর ইউনিয়‌নের রেইচাতে বান্দরবান জেলা প‌রিবার প‌রিকল্পনা অফিস নির্মা‌নের জন‌্য সরকারি প্রায় ১ কো‌টি ৫০ লক্ষ টাকায় ৩০ শতক জমি অধিগ্রহণ করা হয় ২০১৬ সা‌লের দি‌কে। ২০২৩ সা‌লে আওয়ামীলী‌গের আম‌লে শুরু হয় প্রায় ৬ ‌কো‌টি টাকা ব‌্যয়ে ৪তলা এ অফিস ভবন নির্মাণ কাজ। আওয়ামী সরকার পত‌নের পরপরই কাজ‌টি বন্ধ হ‌য়ে যায়। অব‌শে‌ষে আবার নতুন ক‌রে কাজ শুরু হয় মাত্র মাসখা‌নেক আগে। ইতিম‌ধ্যেই এ অফিস ভবন নির্মা‌নের অধিগ্রহন করা জায়গা নি‌য়ে উঠে‌ছে গুরুত্বর অভিযোগ।

স্থানীয়‌দের ম‌তে, সরকারী টাকায় অধিগ্রহন করা জমিতে ভবন নির্মাণ না করে পাশের সরকারি প‌রিত‌্যক্ত খাস জমিতে মা‌টি ভরাট ক‌রে সেখা‌নেই চলছে অফিস ভবন নির্মাণকাজ। আর ভবন নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণ করা প্রায় ৩০ শতক জমি দখলে ‌নি‌য়ে মাছ চাষ কর‌ছেন পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা।

অফিস সূত্রে জানাগেছে, আনুমা‌নিক ২০১৬ সালের দিকে ৩ গুন বে‌শি অর্থ ব‌্যয়ে সরকারি প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকায় রেইচা এলাকায় পিটিআইয়ের পূর্ব পাশে ৩০ শতক জমি অধিগ্রহণ করে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের স্বাস্থ‌্য বিভাগ। উদ্দেশ্য সেখানে বান্দরবান জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের নিজস্ব ভবন নির্মাণ।

এরপর ২০২৩ সালে আওয়ামী সরকা‌রের আম‌লে প্রায় ৬ কোটি টাকা বরাদ্দে ওই এলাকায় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের চারতলা নিজস্ব অফিস ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

তবে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ভবনটি নির্মাণ করা হচ্ছে, ত‌বে অধিগ্রহণ করা সেই ৩০ শতক জমিতে ভবন‌টি নিমার্ণ না ক‌রে করা হ‌চ্ছে পাশের একটি সরকারি খাস পতিত জমিতে। ইতোমধ্যে ভবনের মাটির নিচের পাইলিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে চলছে প্রথম তলার নির্মাণকাজ ।

অন্যদিকে, ভবন নির্মাণের জন্য সরকারি অর্থে অধিগ্রহণ করা প্রায় ৩০ শতক জমি পড়ে রয়েছে পাশেই। অভিযোগ রয়েছে, পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা জমিটি নিজেদের দখলে রেখেছেন। বর্তমানে ওই জমিতে একটি বড় পুকুর নির্মাণ ক‌রে সেখানে মাছ চাষ করছেন তারা।

স্থানীয়দের প্রশ্ন—সরকার যে জমি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে কোটি টাকা ব্যয়ে অধিগ্রহণ সেই জমিতে ভবন নির্মাণ না করে পাশের খাস জমিতে কেন করা হচ্ছে, অধিগ্রহন করা জ‌মি‌টির এখন কি হ‌বে? একই সঙ্গে অধিগ্রহণ করা জমিটি যদি অফিসের কাজে প্রয়োজন না-ই হয়, তাহলে সেটি কেন সরকার‌কে অবগত না ক‌রে দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে?

এ বিষয়ে নির্মাণকাজের ঠিকাদার মোজাফ্ফর বলেন, কাজ‌টি শুরু হয় ২০২৩সা‌লে আওয়ামী সরকা‌রের আম‌লে। কিন্তু আওয়ামী সরকার পত‌নের পর ঠিকাদার পা‌লি‌য়ে যাওয়ায় কাজ‌টি প্রায় ২বছর বন্ধ ছিল। বর্তমা‌নে এটি আমি কি‌নে নি‌য়ে নতুন ভা‌বে কাজ শুরু ক‌রে‌ছি। তি‌নি আরো ব‌লেন, অধিগ্রহণ করা জায়গায় ভবন নির্মাণ করা না হলেও পাশের লাগোয়া জায়গাতেই ভবনটি নির্মাণ করা হচ্ছে। তার দাবি, এতে দোষের কিছু নেই; বরং অধিগ্রহণ করা জায়গার চেয়ে বর্তমান জায়গাটি আরও বে‌শি সুন্দর।

এদি‌কে এ নি‌য়ে রেইচা এলাকার স্থানীয় জনগ‌নের মা‌ঝে ক্ষোভ দেখা দি‌য়ে‌ছে। তা‌দের ম‌তে, সরকারী টাকায় জায়গা অধিগ্রহন ক‌রে তা ব‌্যক্তিগত সম্প‌ত্তি‌তে রূপান্তর করা এত সহজ কিভা‌বে?

রেইচার বা‌সিন্দা ও ব‌্যবসায়ী কা‌সেম ব‌লেন, সরকারী অধিগ্রহ‌নের জায়গায় প‌রিবার প‌রিকল্পনার অফিস নির্মাণ না ক‌রে করা হ‌চ্ছে অন‌্য জায়গায়। আর অধিগ্রহন করা জায়গায় মাছ চাষ করা হ‌চ্ছে। এমনটি কখনো শু‌নি‌নি। আস‌লেই সরকারী লো‌কেরা যা ইচ্ছে তাই কর‌তে পা‌রে।

এ ‌নি‌য়ে রেইচার ৩নং ওয়ার্ড মেম্বার নুরুন্নবী ব‌লেন, অধিগ্রহন করার সময় আমি নি‌জে ছিলাম। জেলা প্রশাসক কার্যাল‌য়ে আমি নি‌জে ফাইলে স্বাক্ষর দি‌য়ে স্বাক্ষী হ‌য়ে‌ছি। ত‌বে যে জায়গায় ভবন নির্মাণ হ‌চ্ছে এটি অধিগ্রহ‌নের জায়গা না, অধিগ্রহ‌নের জায়গা পি‌টিআই এর পূর্ব দি‌কে যেখা‌নে এক‌টি পুকুর র‌য়ে‌ছে।

অধিগ্রহন করা জায়গার মা‌লি‌কের ছে‌লে চে‌হিং মারমা ব‌লেন, অধিগ্রহন ক‌রে‌ছে পি‌টিআই এর পূর্ব পা‌শের জায়গা আর ভবন নিমার্ণ কর‌ছে পি‌টিআই এর সাম‌নের অং‌শের জায়গায়। এটিও আমা‌দের জায়গা। কর্মকর্তারা এসে জোর ক‌রে দখল ক‌রে এখা‌নে ভবন নির্মাণ কর‌ছে। আবার সে‌টিও দখ‌লে রে‌খে‌ছে। তি‌নি ব‌লেন, বর্তমা‌নে যে জায়গা‌টি‌তে ভবন নির্মাণ হ‌চ্ছে এখা‌নে নিচু ছিল, আমা‌কে দি‌য়ে মা‌টি ভরাট ক‌রি‌য়ে ভরা‌টের আড়াই লাখ টাকাও তারা আত্মসাৎ ক‌রে‌ছে। তি‌নি আরো ব‌লেন, অধিগ্রহ‌নের পু‌রো টাকাও আমা‌দের দেয়া হয়‌নি। অর্ধেক কর্মকর্তারাই নি‌য়ে গে‌ছে। তি‌নি আক্ষেপ ক‌রে ব‌লেন, এসব নি‌য়ে কার কা‌ছে বিচার দিব?

এবিষ‌য়ে প‌রিবার প‌রিকল্পনা অধিদপ্ত‌রের সা‌বেক উপপ‌রিচালক ডা: অংচালু মারমা ব‌লেন, এখা‌নে জায়গা কেনা হ‌য়ে‌ছে ২দা‌গে। দাগ নি‌য়ে একটু উলটপালট হ‌য়ে‌ছে। ভবন নির্মাণ হ‌চ্ছে এটিও ভব‌নেরই জায়গা। ওদি‌কেরটাও ভব‌নের জায়গা। তি‌নি ব‌লেন, এটি নি‌য়ে তদন্ত হ‌লে আমি একা না, অ‌ফি‌সের আরো অনে‌কেই বিপ‌দে পড়‌বে, কারণ এটা‌তে অনে‌কেই জ‌ড়িত।

এবিষ‌য়ে প‌রিবার প‌রিকল্পনা অধিদপ্ত‌রের উপপ‌রিচালক ডা: লে‌নিন তালুকদার (ভা:) ব‌লেন, আমি অধিগ্রহ‌নের সময় ছিলাম না। কাজ শুরু হওয়ার প‌রে এসে‌ছি। ‌অধিগ্রহ‌নের জায়গায় অফিস ভবন করা হ‌চ্ছেনা বিষয়‌টি স্বীকার ক‌রে তি‌নি ব‌লেন, আপ‌নি অফিসে আসেন, তখন বিস্তা‌রিত আলাপ করা হ‌বে। কিন্তু ক‌য়েকবার অফিস গি‌য়ে তা‌কে আর পাওয়া যায়‌নি।

এদি‌কে বান্দরবান জেলা প্রশাস‌কের কার্যাল‌য়ের এলএ শাখায় যোগা‌যোগ কর‌লে তারাও জানায় ভূ‌মি অধিগ্রহনের জায়গায় অফিস করা হ‌চ্ছেনা।