কান পাতলে এখনো যেন, পিচঢালা রাজপথে প্রতিধ্বনিত হয়, সেই ঐতিহাসিক হুঙ্কার ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়’।
সময়টা খুব দূরের নয়, অথচ এর ঐতিহাসিক আবেদন শতাব্দীর সমান গভীর। মনে পড়ে সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোর কথা। যখন সামাজিক পরিচয় ও স্বার্থের ঊর্ধ্বে, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাজপথে নেমেছিল সাধারণ মানুষ।
কোনো পদবী বা রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের জন্য নয়, উদ্দেশ্য ছিল কেবল একটি সাম্যভিত্তিক, বৈষম্যহীন নতুন ভোরের সূচনা। শ্রমজীবী থেকে শিক্ষার্থী, সবার ত্যাগেই রচিত হয়েছিল এই গণঅভ্যুত্থান। বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে যারা এদেশের মানুষকে নতুন সূর্য উপহার দিলেন, ভেবেছিলাম সেই আত্মত্যাগ ঘুচিয়ে দেবে সব অনিয়মের প্রাচীর।
কিন্তু নির্মম বাস্তবতা, যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়ে তরুণ সমাজ জীবন বাজি রেখেছিল, সেই একই ব্যাধি নতুন রূপে শিকড় গেড়েছে বিজয়ীদেরই একাংশের হাত ধরে। রাজপথের রক্তের দাগ পুরোপুরি শুকানোর আগেই শুরু হয়েছে রাষ্ট্রীয় সনদ, ভাতা আর আর্থিক অনুদান দখলের নোংরা প্রতিযোগিতা। গণঅভ্যুত্থান কি তবে শুধুই ব্যবস্থার রদবদল ছিল? প্রশ্নটি আজ কুড়িগ্রামের সীমানা পেরিয়ে গোটা বিবেকবান মানুষের মনে দোলা দিচ্ছে।
চলুন… উন্মোচন করা যাক পর্দার আড়ালের সেই থমথমে সত্য, কীভাবে ত্যাগের সাথে বেঈমানি করে গড়ে উঠেছে স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির সিন্ডিকেট। যেখানে, স্ত্রীর হাত থেকে রেহাই পায়নি শহীদ স্বামীও। পরিবারের মাঝেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বার্থ।
যাচাই কমিটিতে অনিয়মের অভিযোগ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কুড়িগ্রামে জুলাই আহত ১৩৩ ও ৯জন শহীদের তালিকা পর্যালোচনায় একটি বিশেষ যাচাই কমিটি গঠিত হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সেই কমিটিতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রতিনিধি হিসেবে, অন্তর্ভুক্ত করা হয় আতিক সাদিক ও আপেল মাহমুদ নামের দুই সাবেক সমন্বয়ককে।
কমিটির সদস্য আপেল মাহমুদের বিরুদ্ধে মাঠে কোনো দুর্নীতির প্রমাণ না মিললেও, অন্য সদস্য আতিক সাদিকের বিরুদ্ধে উঠতে থাকে ক্ষমতার অপব্যবহারের চাঞ্চল্যকর তথ্য। কমিটিতে থাকার সুযোগে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ডেটা এন্ট্রি প্রক্রিয়ায় সরাসরি প্রভাব বিস্তার শুরু করেন তিনি। একপর্যায়ে কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় তার কব্জায়।
গেজেট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আতিক সাদিক প্রথমে ‘সি’ ক্যাটাগরিতে থাকলেও প্রভাব খাটিয়ে নিজের নাম উন্নীত করেন ‘বি’ ক্যাটাগরিতে। শুধু তা-ই নয়, একই পরিবারের তিনজন স্থান পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় এই তালিকায়। যেখানে তার ভাই রেদোয়ানুল ইসলাম হৃদয় ‘বি’ এবং বোন মাশরুফা আক্তার গেজেটভুক্ত হয়েছেন ‘সি’ ক্যাটাগরিতে।
অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রণালয়ে গোপন যোগাযোগের গল্প শুনিয়ে নিজেই নিজের নাম ভেরিফাই করেন আতিক। ক্যাটাগরি পরিবর্তনের পাশাপাশি স্বজনদের সুবিধা দেয়া এবং স্থানীয় অনুদান উত্তোলনে একটি স্বার্থান্বেষী বলয় গড়ে তোলেন তিনি। এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আরেক শীর্ষ প্রতিনিধি ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করলেও, রহস্যজনক কারণে তিনি অভিযুক্তের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলেন।
বাংলা এডিশনের অনুসন্ধানী দল, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আতিক সাদিকের বক্তব্য চাইলে, তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি।
অনুসন্ধানের জল আরও গভীরে গড়ালে বেরিয়ে আসে সিভিল সার্জন অফিসের গোপন তথ্য। কম্পিউটার ডেটা এন্ট্রির দায়িত্বে থাকা মো: হান্নান মিয়ার সন্ধান পায় বাংলা এডিশন। গোপন ক্যামেরায় উঠে আসে তার ভয়ংকর কুকর্মের তথ্য।
আতিকের ভাই-বোনের কথিত ‘যোদ্ধা’ পরিচয়ের পেছনের সত্যতা জানতে বাংলা এডিশন মুখোমুখি হয় জুলাইয়ের আরেক যোদ্ধা আরিফুল ইসলামের সাথে। তার কথায় উঠে আসে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ।
ঘটনার পেছনের সত্য জানতে আতিকের ভাই রেদওয়ানুল ইসলাম হৃদয়ের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে অসংলগ্ন ও কাল্পনিক গল্প বলা শুরু করে।
অন্যদিকে, আতিকের বোন মাশরুফা আক্তারের সাথে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও, সাড়া পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিকদের নাম নিয়ে প্রশ্ন
চেতনার দোহাই দিয়ে সুবিধা আদায়ের এই প্রবণতা থেকে বাদ যাননি কতিপয় গণমাধ্যমকর্মীও। কুড়িগ্রামে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘আহত সাংবাদিক’ হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছেন চারজন সংবাদকর্মী। জানা গেছে, ২৪শের ৪ আগস্ট পৌর বাজারের সামনে আওয়ামী লীগের হামলায় দীপ্ত টিভির জেলা প্রতিনিধি ইউনুছ আলী, সময় টিভির ক্যামেরাপারসন জামিল ও ঢাকা পোস্টের জুয়েল রানা আহত হন। তবে, এদের মধ্যে গেজেটে নাম রয়েছে দীপ্ত টিভির ইউনুছ আলী ও ঢাকা পোস্টের জুয়েল রানার।
এ নিয়ে, অনুসন্ধানে উঠে আসে এক ভিন্ন সত্য। স্থানীয় সাংবাদিক ইউনুছ আলী বিস্ফোরক দাবি করে জানান, তালিকায় স্থান পাওয়া দৈনিক সমকালের জেলা প্রতিনিধি সুজন মোহন্ত সম্পূর্ণ ভুয়া। একইসাথে ফুলবাড়ীর ‘যায়যায়দিন’ প্রতিনিধি ইউনুছ আলী আনন্দের নাম গেজেটে থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ওই সাংবাদিকের এমন বিস্ফোরক মন্তব্যের পর, ঘটনার প্রকৃত সত্য উন্মোচনে যোগাযোগ করা হয় সুজন মহন্তের সাথে। জানতে চাওয়া হয়, আন্দোলনের দিনগুলোতে ঠিক কীভাবে ও কোন পরিস্থিতিতে তারা আহত হয়েছিলেন? উত্তরে তিনি দাবি করেন, সংবাদ সংগ্রহের সময় তারা একে অপরকে রক্ষা করতেই আহত হয়েছেন।
এই ধোঁয়াশা দূর করতে জেলা শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে ফুলবাড়ী উপজেলায় সরেজমিন অনুসন্ধানে যায় টিম বাংলা এডিশন। তবে, অনুসন্ধানী দলের উপস্থিতি টের পেয়ে গা ঢাকা দেন স্থানীয় সাংবাদিক ইউনুছ আলী আনন্দ।
ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে ফুলবাড়ীর সম্মুখসারির যোদ্ধাদের মুখোমুখি হয় ‘টিম বাংলা এডিশন’। তাদের ভাষ্যমতে, স্থানীয় কোনো গণমাধ্যমকর্মীই সেখানে আহত হননি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলার পরবর্তীতে, মুঠোফোনে ইউনুছ আলী আনন্দের সাথে কথা হলেও, ক্যামেরার সামনে আসতে সাফ মানা করে দেন তিনি।
অথচ, অন্যদিকে দেখা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রকৃত আহত ব্যক্তিরা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ন্যায়বিচারের দাবিতে প্রশাসনিক দপ্তরে দপ্তরে ঘুরছেন। হাতে প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে স্পষ্ট জবাব না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
শহীদ রাশেদুলের পরিবারে প্রতারণা
এদিকে, জালিয়াতির সব সীমা যেন অতিক্রম করেছে এক জুলাই শহীদের হতভাগা মায়ের সাথে ঘটে যাওয়া প্রতারণা। পোশাক শ্রমিক, নাগেশ্বরীর সন্তান রাশেদুল ইসলাম জুলাই আন্দোলনে ঢাকার রাজপথে প্রাণ হারান।
পরে, গেজেটে শহীদ হিসেবে নাম উঠলেও, রাশেদুলের মায়ের সাথে ঘটে গেছে এক চরম প্রতারণা। বিয়ের মাত্র ২২ দিনের মাথায় প্রাণ হারানো রাশেদুলের, সরকারি ফারায়েজ আইন অনুযায়ী অনুদান পাওয়ার কথা ছিল বাবা, মা ও স্ত্রীর। কিন্তু স্বজনদের কূটকৌশল ও জালিয়াতির কারণে এক কানাকড়িও পাচ্ছেন না শহীদের হতভাগা মা।
মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতার, প্রায় পুরোটা একাই হাতিয়ে নিচ্ছেন, শহীদ রাশেদুলের স্ত্রী। আর বৃদ্ধ বাবাকে দেয়া হচ্ছে ৭ হাজার টাকা। ফিক্সড ডিপোজিটের ৩০ লাখ টাকার অর্ধেক পেয়েছেন স্ত্রী এবং বাকি অর্ধেক বাবা। অথচ, অভাগী মায়ের কপালে জোটেনি কিছুই।
আরো অবাক করা বিষয় হলো, জুলাই শহীদ রাশেদুলের দাফনের দিন, মোহরানার টাকার জন্য মরদেহ আটকে রাখার মতো, নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছিল তার স্ত্রীসহ ওই পক্ষের স্বজনরা। অথচ, সেই স্ত্রীই এখন সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে।
প্রশাসনের নীরবতা
ভুয়া ক্যাটাগরি বাগিয়ে নেয়া, গ্যাজেটে জুলাই যোদ্ধা পরিচয়ে সাংবাদিকের নাম অন্তর্ভূক্তি, আর শহীদ পরিবারের রক্তে কেনা হক লুটে খাওয়ার মহা আয়োজন। এই পুরো অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় কুড়িগ্রাম জেলার ‘জুলাই আহত ও শহীদ যাচাই-বাছাই কমিটি’র শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের সাথে।
কিন্তু, মেলেনি দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে, উপযুক্ত কোনো বক্তব্য। কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসকের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি বিষয়টি নিয়ে সিভিল সার্জনের সাথে বলতে বলেন।
কমিটির সদস্য সচিব ও পুলিশ সুপার খন্দকার ফজলে রাব্বির কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও, তিনি ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।
একইভাবে, কুড়িগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ স্বপন কুমার বিশ্বাসের কার্যালয়ে গিয়ে সাক্ষাৎকার নেয়া হলেও, সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি তার।
তবে, পুরো কমিটির নীরবতার মাঝে কিছুটা ব্যতিক্রমী সুর শোনা গেছে, জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কণ্ঠে। তিনি জানান, তালিকায় অনিয়ম বা ভুয়া অন্তর্ভুক্তির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে দ্রুত।
কারা এঁকেছে এই প্রতারণার নিপুণ ছক? কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার আর সিন্ডিকেটের কারসাজিতে শহীদের রক্ত ও ত্যাগের ইতিহাস পরিণত হচ্ছে নিখুঁত এক জালিয়াতিতে? শহীদের তাজা রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে এমন নির্মম অনিয়ম ও প্রতারণা কি তবে চলতেই থাকবে? সমাধান খোঁজার দায় এখন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের।
আরও পড়ুন:







