শুক্রবার

৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২০ ভাদ্র, ১৪৩৩

উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসের ভয়াল ছায়া

মেজবাহ ইমন চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৪:৩৯

শেয়ার

উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসের ভয়াল ছায়া
ছবি সংগৃহীত

কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প। যেখানে রাত হলেই নেমে আসে এক অজানা আতঙ্ক। গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভাঙে শিশুদের। আর প্রাণ বাঁচতে দিগ্বিদিক ছুটতে হয় সাধারণ মানুষকে। অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের আড়ালে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্যে সেখানে সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।

উখিয়ার ৩১টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে সন্ত্রাসবাদের নানা অভিযোগ। বিশেষ করে আরএসও ও এআরএ’র মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই ঘটছে সংঘর্ষ, গোলাগুলি, অপহরণ ও হত্যার মতো নির্মম ঘটনা।

ক্যাম্প-টুয়েন্টিতে ছুরিকাঘাত

অভিযোগ রয়েছে সম্প্রতি ক্যাম্প-টুয়েন্টিতে আরএসও’র ৫ থেকে ৬ জন সদস্য অতর্কিতভাবে ছুরিকাঘাত করে মোহাম্মদ আনোয়ার নামের এক ব্যক্তিকে। এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে মাটিতে তিনি লুটিয়ে পড়লে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পরে, ক্যাম্পের লোকজন তাকে উদ্ধার করে প্রথমে ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে তাকে পাঠানো হয় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে।

মোহাম্মদ আনোয়ারের ওপর এই হামলার ঘটনায় ক্যাম্প-২০-এর ডাকাত নূর মোহাম্মদ, ডাকাত মোস্তাক আহমেদ, আরিফ উল্লাহ, আবু তৈয়ব, মোহাম্মদ রাফি ও মোহাম্মদ ফারুকের বিরুদ্ধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

ক্যাম্প-৮ই-তে গোলাগুলি

তার কিছুদিন আগেই, গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ক্যাম্প-৮ই এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আরএসও ও এআরএ’র মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে উঠে আসে।

অভিযোগ রয়েছে, গোলাগুলি চলাকালে হঠাৎ একটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় ছয় বছরের এক শিশুর বুকে। সন্তানকে বাঁচাতে ছুটে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন তার মা মিনারা বেগমও।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, গুরুতর অবস্থায় মা ও ছেলেকে প্রথমে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু গত সোমবার (৩১ আগস্ট) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই শিশুর মৃত্যু হয়। অপরদিকে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় শিশু ও নারীসহ অন্তত আটজন গুলিবিদ্ধ হওয়ার তথ্যও উঠে আসে স্থানীয় সূত্রে।

এই গোলাগুলির ঘটনায় আরএসও কমান্ডার ইমন, মোহাম্মদ আজিজ ও রহমত উল্লাহসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেও ক্যাম্পের বাসিন্দারা ভয়ের কারণে মুখ খুলতে রাজি নয়নি।

অস্ত্র ও অপরাধের অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানিয়েছে, আরএসও ও এআরএ’র সদস্যদের কাছে রয়েছে ৯ মিলিমিটার পিস্তল থেকে শুরু করে একে-৪৭-এর মতো আগ্নেয়াস্ত্র। আর এসব অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মাদক বিস্তার, হত্যা, অপহরণ ও মানবপাচারের মতো গুরুতর অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডে রাজি না হলে দেয়া হয় পরিবারসহ হত্যার হুমকি। অভিযোগ রয়েছে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের যোগসাজশের কারণেই এমন পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। এমনকি তাদের কাছ থেকে নিয়মিত কমিশন নিয়ে উখিয়া ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের সুযোগ তৈরি করে দেয়ার অভিযোগও উঠেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে।

সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা

অভিযোগের তীর এখানেই শেষ নয়। জানা যায়, সংবাদ সংগ্রহে ক্যাম্পে প্রবেশ করতে গেলেই নানা বাধার মুখে পড়তে হয় সাংবাদিকদের। আরআরআরসি কিংবা ক্যাম্প ইনচার্জের অনুমতির কথা বলে প্রবেশপথেই আটকে হেনস্তা করা হয় গণমাধ্যমকর্মীদের। ফলে ক্যাম্পের ভেতরের প্রকৃত চিত্র কতটা বাইরে আসছে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা সংশয়।

কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একদিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তার, অন্যদিকে একের পর এক গোলাগুলি, ছুরিকাঘাত, অপহরণ ও হত্যার অভিযোগ—সব মিলিয়ে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগের পরিবেশ।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; সীমান্তবর্তী এই বিশাল জনপদে বাংলাদেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্যও তা বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ। তাদের মতে, সশস্ত্র এই সন্ত্রাসী বাহিনী মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আগেই দ্রুত তাদের দমন করা এখন সময়ের দাবি।