শুক্রবার

৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২০ ভাদ্র, ১৪৩৩

প্যারালাইসিসে আক্রান্ত দিনমজুর বাবা থেমে গেছে হাফেজ রাকিবুলের স্বপ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:১৪

শেয়ার

প্যারালাইসিসে আক্রান্ত দিনমজুর বাবা থেমে গেছে হাফেজ রাকিবুলের স্বপ্ন
ছবি বাংলা এডিশন

যে হাতে কোরআন ও বই থাকার কথা, সেই হাতেই এখন সংসারের দায়িত্ব। কোরআন মুখস্থ করে হাফেজ হয়েছেন রাকিবুল ইসলাম। স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা করে বড় আলেম হওয়ার। কিন্তু বাবার অসুস্থতায় সেই স্বপ্ন এখন থমকে গেছে।

সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার মেঘাই ভদ্রঘাঁট গ্রামের আব্দুল মান্নান প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে বিছানায়। তার চিকিৎসা, সংসারের খরচ আর তিন সদস্যের বেঁচে থাকার লড়াই, সবকিছুর ভার এখন রাকিবুলের কাঁধে। দিনে আয় করেন মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ টাকা।

বাবার অসুস্থতায় থেমে যাওয়া স্বপ্ন

একসময় মাটি কেটে ও দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতেন আব্দুল মান্নান। স্ত্রী রাশেদা বেগম কাজ করতেন গার্মেন্টসে। ছেলে রাকিবুল পড়াশোনা করেছেন ঢাকার সাভারের একটি কওমি মাদ্রাসায়। স্বপ্ন ছিল হাফেজ হওয়ার পাশাপাশি দ্বীনি শিক্ষায় নিজেকে গড়ে তোলা।

কিন্তু হঠাৎ খাবার খাওয়ার সময় অবশ হয়ে যায় মান্নানের ডান হাত। হাসপাতালে নেয়ার আগেই ধীরে ধীরে অবশ হয়ে পড়ে পুরো শরীর। চিকিৎসকদের ভাষায়, প্যারালাইসিসে আক্রান্ত তিনি। এরপর থেকেই বিছানায় তার দিন কাটছে।

চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালাতে না পেরে স্বামীকে নিয়ে গ্রামে ফিরে আসেন রাশেদা। স্বামীর দেখাশোনার কারণে তিনিও এখন নিয়মিত কাজ করতে পারছেন না। ফলে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হয়ে উঠেছে রাকিবুল।

পরিবারের একমাত্র অবলম্বন রাকিবুল

নিজের কোনো কাজই এখন আর নিজে করতে পারেন না আব্দুল মান্নান। স্ত্রীকেই ধরে বসাতে হয়, শৌচাগারে নিয়ে যেতে হয়, গোসল করাতে হয়, এমনকি খাবারও খাইয়ে দিতে হয়। স্বামীর সেবাতেই দিন-রাত কাটছে রাশেদার।

বাবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে শেষ পর্যন্ত পড়াশোনাও ছাড়তে হয়েছে রাকিবুলকে। এখন স্থানীয় আরাফাত হোটেল নামে একটি মিষ্টির দোকানে কাজ করেন তিনি। দৈনিক ২০০ থেকে ২৫০ টাকা আয় করে সেই অর্থ থেকেই বাবার চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালানোর চেষ্টা করছেন এই হাফেজ।

স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় দিনমজুরির আয়েই কোনোভাবে সংসার চলত। এখন মান্নান অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেই আয়ও বন্ধ। রাকিবুলের সামান্য আয়ে তিন সদস্যের পরিবারটি টিকে আছে। চিকিৎসা ও সংসারের পাশাপাশি ছেলেটির পড়াশোনাও যেন আর্থিক সংকটে হারিয়ে না যায়, এমন সহায়তার প্রত্যাশা তাদের।

চিকিৎসা ও সহায়তার প্রত্যাশা

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে কোনো টাকা লাগে না। সেখান থেকে ওষুধ না পেলেও এবং বাইরে থেকে ওষুধ কেনার সামর্থ্য না থাকলে, আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন কামারখন্দ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা।

অর্থের অভাবে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত আব্দুল মান্নান। আর বাবার অসুস্থতায় কোরআনের হাফেজ রাকিবুলের হাত থেকে নেমে গেছে বই। পরিবারের প্রত্যাশা, চিকিৎসার সুযোগ পেলে আবারও সুস্থ জীবনে ফিরতে পারেন মান্নান। আর সহায়তার হাত বাড়লে মিষ্টির দোকানের কাজ ছেড়ে রাকিবুলও ফিরে যেতে পারে তার মাদ্রাসায়।

বাবার পাশে দাঁড়ানোর যে ত্যাগ রাকিবুল করেছে, তার বিনিময়ে হয়তো আবারও হাতে উঠবে কোরআন ও বই, ফিরে পাবে তার থেমে যাওয়া স্বপ্ন।



আরও পড়ুন: