শুক্রবার

৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৯ ভাদ্র, ১৪৩৩

তিস্তায় এক রাতেই বিলীন ৯০ পরিবারের বসতভিটা, ভাঙনের মুখে দুই শতাধিক

গাইবান্ধা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:২০

শেয়ার

তিস্তায় এক রাতেই বিলীন ৯০ পরিবারের বসতভিটা, ভাঙনের মুখে দুই শতাধিক
ছবি: বাংলা এডিশন

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে এক রাতেই অন্তত ৯০ পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এর মধ্যে ১২ পরিবারের সাতটি টিনের ঘর পুরোপুরি নদীতে চলে গেছে। এছাড়া আরও কয়েকটি পরিবারের ঘরের অংশবিশেষ নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে দুই শতাধিক পরিবার। হঠাৎ করে বসতভিটা হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুর পর্যন্ত উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সিংগীজানি ও লালচামার এলাকায় ভাঙন অব্যাহত থাকায় প্রায় ৯০ পরিবারের বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়।

এর আগে, বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ৩টার দিকে নদীর ভাঙন শুরু হয়। রাতেই প্রায় ৭০ পরিবারের ঘরবাড়ি বিলীন হয়।

স্থানীয়রা জানান, গত কয়েকদিন ধরে তিস্তার পানি কমছিল। তবে বুধবার রাত থেকে পানি কিছুটা বাড়তে শুরু করে। এরপর হঠাৎ করেই ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যায়। চলতি বর্ষা মৌসুমে এ এলাকায় অন্তত চার দফায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনে বসতঘরের পাশাপাশি গাছপালা, হাঁস-মুরগির খামার ও অন্যান্য মালামালও নদীতে চলে গেছে। অনেকে ঘর সরিয়ে নেওয়ার সুযোগও পাননি। ভাঙন আতঙ্কে রয়েছেন নদীতীরবর্তী আরও দুই শতাধিক পরিবার।

এদিকে, বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের তাৎক্ষণিকভাবে শুকনো খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। একইসঙ্গে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন।

তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক মো. মাজেদুর রহমানের নির্দেশনায় নদীভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করা হয়েছে। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে।

অপরদিকে, জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে খিচুড়ি বিতরণ করা হয়েছে। এ সময় উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মো. সামিউল ইসলামসহ স্থানীয় জামায়াত নেতারা ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেন।

এছাড়া নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. মাহমুদুল ইসলাম প্রামানিক। এ সময় কাপাসিয়া ইউনিয়ন বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে গত ১৮ আগস্ট ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি তিস্তার ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ওই বিদ্যালয়টি ছিল চরাঞ্চলের শিশুদের একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ভাঙনের আশঙ্কায় স্থানীয়রা আগেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন।

বিদ্যালয়টি নদীতে বিলীন হওয়ার পরদিন ১৯ আগস্ট ভাঙন ঠেকাতে সেখানে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বিদ্যালয় রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড, উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা একাধিকবার এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এমনকি গত ৮ আগস্ট পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারহাদ হোসেন আজাদ ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে এরপরও বিদ্যালয়টি রক্ষা করা যায়নি।

কাপাসিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হাবিজার রহমান বলেন, 'বর্ষা শুরুর পর থেকেই এলাকায় ভাঙন চলছে। ইতোমধ্যে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ শতাধিক পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। গাছপালা, ঘরবাড়ি ও হাঁস-মুরগিসহ অনেক কিছুই নদীতে চলে গেছে। এখনো দুই শতাধিক পরিবার ঝুঁকিতে রয়েছে। পর্যাপ্ত জিও ব্যাগ ফেললে ভাঙন ঠেকানো সম্ভব হবে।'

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মো. সামিউল ইসলাম বলেন, 'ভাঙনের ফলে অনেক পরিবার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে এমপি সাহেবের নির্দেশনায় প্রায় ২ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি জামায়াতের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে খিচুড়ি বিতরণ করা হয়েছে।'

উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. মাহমুদুল ইসলাম প্রামানিক বলেন, 'ভাঙন ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।'

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, 'ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খোঁজ নেওয়া হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে তাদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী সরকারি নিয়মে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ভাঙন ঠেকাতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হয়েছে।'

গাইবান্ধা জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, 'ভাঙন শুরু হওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও জিও ব্যাগ ফেলা হবে।'

তিনি বলেন, 'ভাঙন না থাকলে জিও ব্যাগ ফেলার অনুমতি পাওয়া যায় না। ভাঙন দেখা দেওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে অনুমতি নিয়ে কাজ শুরু করা হয়।'



আরও পড়ুন: