চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নে জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে মাদরাসা সুপার মাওলানা আবুল কাশেমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সাড়ে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট জমা হয়নি। এ ঘটনায় ছয়জনকে আসামি করে মামলা করা হলেও এজাহারভুক্ত ৩ আসামি অগ্রিম জামিন নিয়েছেন এবং ১ আসামী এখনো গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতের পরিবারের সদস্যরা।
গত ১৩ মে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের জান মোহাম্মদ পাড়া এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত আবুল কাশেম ওই এলাকার আব্দুর সোবহানের ছেলে এবং চরম্বা জামিউল উলুম দাখিল মাদরাসার সুপার ছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আবুল কাশেমের পরিবারের সঙ্গে তাঁর চাচাতো ভাইদের দীর্ঘদিন ধরে জায়গা-জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। ঘটনার দিন বিরোধপূর্ণ জায়গায় প্রতিপক্ষের লোকজন পাকা স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু করলে আবুল কাশেম সেখানে গিয়ে বাধা দেন। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও সংঘর্ষ শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিপক্ষের লোকজন লাঠি, গাছের গুঁড়ি ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আবুল কাশেমের ওপর হামলা চালায়। একপর্যায়ে মাথায় আঘাত পেয়ে তিনি গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
পরে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় নিহতের বোন সখিনা খাতুন, চাচাতো ভাই শাহ আলমও আহত হন।
ঘটনার দুই দিন পর, ১৫ মে নিহতের ছেলে ফোরকান আহমদ বাদী হয়ে লোহাগাড়া থানায় ছয়জনকে এজাহারভুক্ত আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন হারুনুর রশিদ, সামশুল ইসলাম, জামাল হোসেন ওরফে জামাল ড্রাইভার, সোয়াইবুল হক আদন, হারুনুর রশিদের স্ত্রী ফেরদৌসি আক্তার এবং ইয়াকুব মিয়া ওরফে ইয়াকুব মিস্ত্রী।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, আসামিরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বিরোধপূর্ণ জায়গায় প্রবেশ করে স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু করেন। আবুল কাশেম বাধা দিলে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় তাঁকে পেরেকযুক্ত বাটাম দিয়ে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করার অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁকে উদ্ধারে এগিয়ে গেলে তাঁর বোন সখিনা বেগম ও চাচাতো ভাই শাহ আলমের ওপরও হামলা চালানো হয়।
মামলার পর পুলিশ সামশুল ইসলাম ও হারুনুর রশিদকে গ্রেপ্তার করে। হত্যাকাণ্ডের পরে বিভিন্ন সময় আসামিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে চরম্বা নয়াবাজারে মানববন্ধনও করেন মাদরাসাটির সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী এবং স্থানীয়রা।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্তের অগ্রগতি ও চার্জশিট দাখিল না করায় মামলার বাদী ও নিহতের পরিবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দাখিল এবং পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।
নিহতের বড় ছেলে এবং মামলার বাদী মো. ফোরকান আহমেদ বলেন, "এজাহারভুক্ত আসামিদের কয়েকজন প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছেন এবং বিভিন্ন মাধ্যমে আমাদের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা প্রশাসনের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে চাই। আমরা চাই, দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলার পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করে তদন্ত শেষ করা হোক এবং চার্জশিট দাখিলের মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রমকে এগিয়ে নেয়া হোক।’
তিনি আরও অভিযোগ করা হয়, জামাল ড্রাইভার নামে পরিচিত আসামি উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন ব্যক্তিকে প্রভাবিত করে চার্জশিট থেকে তাঁর নাম বাদ দেয়ার চেষ্টা করছেন বলে তারা শুনেছেন। তবে এ বিষয়ে কোনো প্রমাণ তাঁদের কাছে নেই বলেও জানান তিনি।
তিনি প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘মামলার এজাহারভুক্ত ছয় আসামিই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে আমরা মনে করি। নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করলে এলাকাবাসীর কাছ থেকেও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যাবে। আমরা চাই, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসুক এবং কোনো আসামি যেন অন্যায়ভাবে চার্জশিট থেকে বাদ না যায়।’
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন বলেন, "মামলার আসামিদের মধ্যে দুইজন গ্রেফতার, তিনজন জামিনে এবং একজন পলাতক রয়েছেন। পলাতক আসামির নাম হলো জামাল। আমরা খুব শীঘ্রই তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়ে দিবো। "
লোহাগাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: রাশেদুল ইসলাম বলেন, "দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আরও কয়েকজন আদালত থেকে জামিন নিয়েছে। পলাতক আসামি জামলকে গ্রেফতার করার জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।"
আরও পড়ুন:







