চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় পাঁচটি ডিগ্রি কলেজ থাকলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি (পাস) পরীক্ষার জন্য নেই কোনো পরীক্ষাকেন্দ্র। ফলে উপজেলার বিভিন্ন কলেজের শত শত শিক্ষার্থীকে প্রায় ৩০–৩৫ কিলোমিটার দূরে আনোয়ারা সরকারি কলেজে গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে হচ্ছে। এতে উপজেলার পাঁচটি ডিগ্রি কলেজ–পশ্চিম বাঁশখালী উপকূলীয় ডিগ্রি কলেজ, বাঁশখালী ডিগ্রি কলেজ, বাঁশখালী গার্লস ডিগ্রি কলেজ, সরকারি আলাওল ডিগ্রি কলেজ ও মাস্টার নজির আহমেদ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাতায়াতে নানা ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কলেজগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাঁশখালীর পাঁচটি ডিগ্রি কলেজে বর্তমানে প্রায় ৯০০ থেকে ১০০০ শিক্ষার্থী ডিগ্রি কোর্সে অধ্যয়ন করছেন। তাদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী প্রতিবছর আনোয়ারা সরকারি কলেজে গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, একটি পরীক্ষায় অংশ নিতে পরীক্ষার সময়ের চেয়ে যাতায়াতেই কয়েক ঘণ্টা ব্যয় হয়ে যায়। স্থানীয় সড়কের যানজট, গণপরিবহনের অনিয়মিত চলাচল ও দীর্ঘ দূরত্বের কারণে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানো নিয়েও তাদের উদ্বেগে থাকতে হয়। শুধু শিক্ষার্থী নয়, চাকরি, ব্যবসা কিংবা সংসারের দায়িত্বের পাশাপাশি ডিগ্রি কোর্সে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের জন্য এ ভোগান্তি আরও বেশি। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের অনেকে ছোট সন্তান ও পারিবারিক দায়িত্ব সামলে দূরের কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেন।
বাঁশখালী সরকারি আলাওল ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘আশির দশক থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বাঁশখালীতে ডিগ্রি পরীক্ষার কেন্দ্র ছিল। পরবর্তী সময়ে পর্যাপ্ত পরীক্ষার্থী না থাকায় কেন্দ্রটি রাখা সম্ভব হয়নি। আমার দায়িত্বকালীন ২০২৩ সালে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনা করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বরাবর পরীক্ষাকেন্দ্র পুনর্বহালের জন্য আবেদন করেছিলাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেটি বাস্তবায়ন হয়নি।’ কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কাজী মো. সোলাইমান বলেন, ‘বাঁশখালীতে বর্তমানে ডিগ্রি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা পর্যাপ্ত। শুধু আমাদের কলেজেই তিনটি বর্ষ মিলিয়ে প্রায় ৫০০ ডিগ্রি পরীক্ষার্থী রয়েছে। এত দূরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে হচ্ছে, যা তাদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভোগের।’
বাঁশখালী গার্লস ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. জমির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘তিনটি বর্ষ মিলিয়ে আমাদের প্রায় ১৫০ জন পরীক্ষার্থী রয়েছে। বাঁশখালীতে ডিগ্রি পরীক্ষার কেন্দ্র থাকা এখন সময়ের দাবি। আমাদের শিক্ষার্থীদের অনেক দূরে গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। এতে তাদের সময় ও অর্থ–দুটিই অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে।’
বাঁশখালী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. ফারুক বলেন, ‘আমি কিছুদিন আগেও বাঁশখালীতে ডিগ্রি পরীক্ষার কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেছি। আমার কলেজের শতাধিক শিক্ষার্থী আনোয়ারায় গিয়ে নানা ঝুঁকি নিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও ভোগান্তি বিবেচনায় বাঁশখালী উপজেলায় অন্তত একটি, সম্ভব হলে দুটি ডিগ্রি পরীক্ষার কেন্দ্র করা যেতে পারে।’
পশ্চিম বাঁশখালী উপকূলীয় ডিগ্রি কলেজের দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বাবুল কান্তি দেব বলেন, ‘বাঁশখালীর বিভিন্ন ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী প্রতিবছর আনোয়ারা সরকারি কলেজে গিয়ে ডিগ্রি পরীক্ষায় অংশ নেয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়া তাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।’ তিনি বলেন, ‘তিন বছর মেয়াদি ডিগ্রি কোর্সে অধ্যয়নরত অনেক শিক্ষার্থী আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনার পাশাপাশি সংসার, চাকরি, ব্যবসা কিংবা বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। তাঁদের অনেকের ছোট ছোট সন্তানও রয়েছে। এ অবস্থায় সংসার ও পেশাগত দায়িত্ব সামলে ৩০–৩৫ কিলোমিটার দূরে গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অত্যন্ত কঠিন।’
শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে বাঁশখালীর কোনো একটি উপযুক্ত ডিগ্রি কলেজে পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়ে কলেজ সংশ্লীষ্টরা বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে একটি পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করা হলে শিক্ষার্থীদের সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি তারা আরও নির্বিঘ্নে পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ পাবে।’
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিটি পরীক্ষার দিন নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই তাদের বাড়ি থেকে বের হতে হয়। দূরপাল্লার যাতায়াত, যানজটের কারণে সময়মতো পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানো নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। যাতায়াতের ভাড়া ও খাবারের জন্য বাড়তি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি একটি পরীক্ষার জন্য প্রায় পুরো দিনই ব্যয় হয়ে যায়। একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, ‘একটি পরীক্ষার জন্য শুধু পরীক্ষার সময়টুকু নয়, যাওয়া-আসাতেই কয়েক ঘণ্টা চলে যায়। দূরের কেন্দ্রে যেতে ভাড়া ও খাবারের জন্যও অতিরিক্ত টাকা খরচ হয়। বাঁশখালীতে পরীক্ষাকেন্দ্র থাকলে সময় ও অর্থ–দুটিই সাশ্রয় হতো।’
এ বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বাংলা এডিশনকে বলেন, ‘বাঁশখালীতে পাঁচটি ডিগ্রি কলেজ রয়েছে এবং এসব কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও সহস্রাধিক। অথচ ডিগ্রি পরীক্ষার জন্য উপজেলায় কোনো পরীক্ষাকেন্দ্র না থাকায় শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অন্য উপজেলায় গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে হচ্ছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে তাদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভোগের। শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বাঁশখালীতে একটি ডিগ্রি পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার চেষ্টা করব।’
সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মতে, একটি উপজেলায় একাধিক ডিগ্রি কলেজ থাকা সত্ত্বেও সেই উপজেলার শিক্ষার্থীদের অন্য উপজেলায় গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেয়ার বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীর সংখ্যা, কলেজের অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা যাচাই করে বাঁশখালীতে অন্তত একটি ডিগ্রি পরীক্ষাকেন্দ্র নির্ধারণ করা যেতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পরিদর্শন ও অবকাঠামোগত যাচাই শেষে উপযুক্ত কোনো কলেজকে পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে অনুমোদন দিলে দীর্ঘদিনের এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে।
আরও পড়ুন:







