চোরাইপথে ভারত থেকে আসা জিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটকের পর ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে তা জিম্মায় নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে। জব্দ পণ্যের প্রকৃত মালিক না হয়েও ভুয়া এলসি, ভাউচার, নিলামের কাগজ, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন নথি ব্যবহার করে ‘বৈধ মালিক’ সেজে আদালত থেকে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের জিরা জিম্মায় নিয়েছে চক্রটি। সংঘবদ্ধ এই চক্রটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন হবিগঞ্জ জেলা কৃষকলীগের নেতা সুলতান মাহমুদ আরজু নামে একব্যক্তি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভারতীয় অবৈধ পণ্য হবিগঞ্জ জেলায় আটকের পর মামলা হওয়ার সাথে সাথেই চক্রটির সদস্যরা জিম্মায় নিতে শুরু করেন তোড়জোড়। অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা মামলা হওয়া মাত্রই মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য সিন্ডিকেটের সদস্যদের হাতে তুলে দেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সুলতানের ভাই আব্দুল হাসান রাজুর মাধ্যমে চক্রের সদস্যরা এলসি, নিলামসংক্রান্ত কাগজ, ভাউচার, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন নথি তৈরি করে জব্দ পণ্যের মালিকানা দাবি করে আদালতে জিম্মার আবেদন করেন। নিম্ন আদালতে আবেদন নামঞ্জুর করার পর উচ্চ আদালত থেকে নিয়ে আসা হয় আদেশ। সেই আদেশের বলে জিম্মায় নেয় প্রতারক চক্র। অথচ নিম্মায় নেয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা প্রায় সকল ডকুমেন্টসই থাকে ভূয়া, একই কাগজ ব্যবহার করা হয় একাধিকবার। এমনকি পুলিশি তদন্তে মালিকানার সঠিকতা পাওয়া না গেলেও আদালত কিভাবে জিম্মায় দিচ্ছে এসব পণ্য? তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধূম্রজাল।
অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেটটি স্থানীয় পর্যায়ের কতিপয় রাজনৈতিক নেতাকে নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে রাজনৈতিক শেল্টারও নিয়ে থাকে। এই রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে জব্দ পণ্য জিম্মার প্রক্রিয়ায় চাপ সৃষ্টি, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং অভিযোগ ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়।
অন্তত ২০টি জিম্মা-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় এ ধরনের একাধিক ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব নথির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জব্দ পণ্যের মূল্য হিসাব করলে গত ২ বছরে অন্তত ২০ কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য জিম্মায় নেয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এর বাহিরেও রয়েছে আরও কোটি কোটি টাকার হিসেব।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতীয় জিরা দেশে প্রবেশের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে চালান জব্দ ও মামলা হলে শুরু হয় কথিত ‘মালিকানা প্রতিষ্ঠার’ প্রক্রিয়া। জব্দ হওয়ার সময় যারা আটক বা মালিকানা দাবি করেন কিংবা চালানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউই আদালতে যান না, তাদের পরিবর্তে সুলতান চক্রের সদস্যরা আদালতে এসে জব্দ পণ্যের মালিকানা দাবি করেন। এ সময় তারা আদালতে জমা দেন আমদানি বা নিলামের বিভিন্ন কাগজপত্র। এসব নথির মধ্যে রয়েছে এলসি, ভাউচার, নিলামের কাগজ, ট্রেড লাইসেন্স ও অন্যান্য ব্যবসায়িক কাগজপত্র। যা সিলেটের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সংগ্রহ করে কারসাজি করেন সুলতান মাহমুদ আরজু ও তার ভাই আব্দুল হাসান রাজু।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, জব্দ পণ্য জিম্মায় নেয়া কেউই ব্যবসায়ী নন। 'মালিক’ দাবিদারদের কেউ কারখানার শ্রমিক আবার কেউ দাদন ব্যবসায়ী।
গত ৩০ জুলাই মাধবপুর থানায় আটক হওয়া ৬ হাজার কেজি জিরা জিম্মায় নেন সুজন মিয়া নামে একব্যক্তি। যার জব্দ মূল্য ৪২ লক্ষ টাকা। অথচ সুজন শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার স্কয়ার কোম্পানীতে ১২ হাজার টাকা বেতনে শ্রমিকের কাজ করেন। মেসার্স মদিনা স্টোর নামে যে প্রতিষ্ঠানের সত্ত্বাধিকারী দেখিয়ে তিনি জিরা নিয়েছেন সেই প্রতিষ্ঠানের নেই কোন অস্তিত্ব। সুজন দাবি করেন তিনি সরকারকে কোটি টাকা ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে বৈধভাবে ব্যবসা করছেন। একপর্যায়ে অবশ্য স্বীকারও করেন তার কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই। টিন-বিন সনদও নেই তার।
স্থানীয় ইউপি সদস্য সাদেক তালুকদার জানান, সুজন নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান, সে স্কয়ার কোম্পানিতে শ্রমিকের কাজ করার পাশাপাশি এলাকায় ইলেক্ট্রিশিয়ানের কাজ করে। তার কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কখনোই ছিলো না বলেও জানান তিনি।
সুজনের পার্শ্ববর্তী ঘরের বাসিন্দা ও তার বোন জামাই কালা মিয়া জানান, সে এলাকায় ইলেক্ট্রিশিয়ানের কাজ করে। কোটি টাকা ভ্যাট-ট্যাক্স দেয়ার কথা শুনে তিনি হতভম্ব হয়ে যান।
৬ হাজার ৬০০ কেজি জিরা জিম্মায় নেওয়া যুবলীগ নেতা মুক্তার হোসেন এলাকায় দাদন ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। হবিগঞ্জ জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান সেলিমের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করে দাদন ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। প্রতিষ্ঠান এবং ভ্যাট-ট্যাক্স সনদ না থাকলেও শুধু মাত্র ট্রেড লাইসেন্স দেখিয়ে জিম্মায় নিয়েছেন ৪৬ লক্ষ টাকার জিরা।
অন্যদিকে কৃষকলীগ নেতা মোতাব্বির হোসেন কাজল বৈষম্যবিরোধী মামলায় দীর্ঘদিন কারাভোগ শেষে বর্তমানে জামিনে আছেন। গত ৩ মার্চ জেলা ডিবি পুলিশের কাছ থেকে অস্তিত্বহীন হুর ট্রেডার্সের অনুকুলে ৩ হাজার ৬০০ কেজি জিরা জিম্মায় নেয় সে। জিম্মায় নিতে তিনি ব্যবহার করেছেন ভূয়া এনআইডি। তার প্রকৃত এনআইডিতে নাম কাজল মিয়া হলেও আদালতের নথিপত্রে মোতাব্বির হোসেন ব্যবহার করা হয়েছে। সেই জিরার জিম্মা নামার সাক্ষি ও উচ্চ আদালতে তদবিরকার ছিলেন চক্রের অন্যতম হোতা আব্দুল হাসান রাজু। এই রাজু ভূয়া নথি সৃজন, জিম্মার আবেদন, নিম্ন আদালত থেকে হাইকোর্ট পর্যন্ত কার্যক্রম তদারকি ও তদবিরের দায়িত্বে রয়েছেন। নিজেকে শিক্ষানবিশ আইনজীবী পরিচয় দিয়ে দাপিয়ে বেড়ান আদালত পাড়ায়।
যদিও রাজুর দাবি তিনি সরকারকে বছরে কোটি কোটি টাকা ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে বৈধভাবে পণ্য আমদানি করেন। তবে তার নামে টিন-বিন না থাকলেও ফরিদ এন্টারপ্রাইজ নামে তাদের পারিবারিক মুদিমালের একটি দোকান ছিলো ২ বছর ধরে সেটিও বন্ধ রয়েছে।
এদিকে মোতাব্বির হোসেন কাজল নিজেই স্বীকার করেছেন যে তার কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নেই। তার দাবি, কৃষকলীগ নেতা সুলতান মাহমুদ আরজুর হয়ে তিনি ২৫ লাখ ২০ হাজার বছর টাকা মূল্যের জিরা জিম্মায় নিয়েছেন।
আরেক সদস্য ফখর উদ্দিন আফিলেরও নেই দৃশ্যমান কোনো ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড। এর বাহিরে অন্তত ১ ডজন ব্যক্তি এই চক্রের হয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতারণা করে লুটে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য।
অভিযোগের বিষয়ে কৃষকলীগ নেতা ও চক্রের মুলহোতা সুলতান মাহমুদ আরজু দাবি করেন, তিনি সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে এসব ভারতীয় পণ্য ক্রয় করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি অবৈধভাবে কোনো পণ্য আনেন না; বৈধভাবেই এলসির মাধ্যমে পণ্য ক্রয় করেন। এসব পণ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হলে বিভিন্ন ব্যাক্তির মাধ্যমে জিম্মায় নেন। এসময় তিনি মোতাব্বির হোসেন কাজলের মাধ্যমে ৩৬০০ কেজি জিরা জিম্মায় নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। বৈধ ব্যবসায়ী হিসেবে যদি নিজেই পণ্য ক্রয় করে থাকেন, তাহলে নিজের নামে সরাসরি জিম্মায় না নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে জব্দ পণ্য জিম্মায় নেওয়ার প্রয়োজন কেন হলো?
এমন প্রশ্নের কোন সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।
এছাড়াও সুলতান মাহমুদ আরজু নিজেকে র্যাব, ডিবি, বিজিবি সহ বিভিন্ন সংস্থার সোর্স পরিচয়ে সিন্ডেকেটটি নিয়ন্ত্রণ করেন। পাশাপাশি কতিপয় রাজনৈতিক নেতাকে মাসোহারা দিয়ে রাজনৈতিক শেল্টার নেয় সে। নিয়মিত অর্থের বিনিময়ে এসব নেতার প্রভাব ব্যবহার করে সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রশাসনিক ও আইনগত চাপ মোকাবিলা করেন।
এই সিন্ডিকেটের কার্যক্রমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে। কোনো চালান জব্দ হওয়ার পর মামলা দায়েরের সঙ্গে সঙ্গেই মামলার নথি, জব্দ তালিকা, আসামি ও পণ্যের বিস্তারিত তথ্য সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
এর ফলে সিন্ডিকেটটি দ্রুত সম্ভাব্য ‘মালিক’ নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত বা সংগ্রহের সুযোগ পায়। পরে এসব নথি আদালতে দাখিল করে জব্দ পণ্য জিম্মায় নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
ভূয়া তথ্য ব্যবহার করে উচ্চ আদালত থেকে চোরাচালানি পণ্য জিম্মায় নেওয়ার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মহসিন কবির বলেন, আমাদের কাগজপত্র যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না। এইক্ষেত্রে পুলিশ যদি সঠিকভাবে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয় তাহলে আদালত সেটি আমলে নেন। তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি জাল কাগজ দিয়ে একটি ব্লাংকেটের চালান জিম্মায় নেওয়ার বিষয়ে আমরা আপিল বিভাগে আবেদন করি, আদালত সেটি স্থগিত করেন।
পুলিশের তদন্তে মালিকানার সঠিকতা পাওয়া যায়নি এমন চালানও আদালত থেকে জিম্মায় দেয়া হয়েছে এইবিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এমন কিছু অবগত নন বলে জানান।
একই বিষয়ে হবিগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মো. তারেক মাহমুদ বলেন, বিষয়টি এইমাত্র অবগত হয়েছি। আমরা আদালতের নির্দেশ মোতাবেক পূঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করবো।
আরও পড়ুন:







