অধ্যক্ষের ক্ষমতার প্রভাবে পাঠদানের কক্ষে বিয়ের অনুষ্ঠান, মুসলিম শিক্ষকদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগ
ঐতিহ্যবাহী কলেজের বর্তমান চিত্র
১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাহাড়তলী ডিগ্রি কলেজ। ৬ দশমিক ২৮ একরের সুবিশাল এই ক্যাম্পাসে কাগজে-কলমে এমপিওভুক্ত ও খণ্ডকালীন মিলিয়ে ৩২ জন শিক্ষক এবং ১৪ জন কর্মচারী কর্মরত। একসময় হাজারো শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর থাকলেও, বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক মিলিয়ে শিক্ষার্থী নেমে এসেছে মাত্র ১৮শ’তে।
২০১৯ সালের অক্টোবরে শ্যামল কান্তি মজুমদার অধ্যক্ষের চেয়ারে বসার পর থেকেই দৃশ্যপট বদলাতে থাকে। ঐতিহ্যের এই বিদ্যাপীঠ এখন পরিণত হয়েছে অনিয়ম, দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাতন্ত্রের এক অভয়ারণ্যে। পাসের হার তলানিতে, শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি এখন প্রায় শূন্য। শিক্ষকদের সময় কাটে অলস আড্ডায়, আর ক্যাম্পাসের দখল নিয়েছে বহিরাগত মাদকসেবীরা। প্রতিষ্ঠানটি যেন পরিণত হয়েছে কেবলই এক নামসর্বস্ব শিক্ষাকেন্দ্রে।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ
বাংলা এডিশনের অনুসন্ধানে এই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সবচেয়ে ভয়ংকর অভিযোগ, মুসলিম শিক্ষকদের ওপর সুকৌশলে মানসিক নির্যাতন ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত। জোরপূর্বক পূজায় অংশগ্রহণ, প্রসাদ গ্রহণ এবং চাঁদা দিতে বাধ্য করার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই শিক্ষকদের কপালে জুটছে ‘জামায়াত-শিবির’ বা ‘বড় মুসলমান’ তকমা।
অনুসন্ধানী টিমের হাতে আসা মেসেঞ্জার গ্রুপের স্ক্রিনশট ও ফেসবুক পোস্টের নথিতে দেখা যায়, অফিসিয়াল গ্রুপেও শিক্ষকদের কুরুচিপূর্ণ ভাষায় নিয়মিত তিরস্কার করেন এই অধ্যক্ষ। এছাড়াও নামাজের সময় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিটিং ডাকা, এমনকি দাড়ি রাখা নিয়েও কটূক্তি করার অকাট্য প্রমাণ রয়েছে বাংলা এডিশনের কাছে।
তবে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও মানসিক নির্যাতনের এসব গুরুতর অভিযোগ বরাবরের মতোই অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত অধ্যক্ষ শ্যামল কান্তি মজুমদার। তার দাবি, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও কাল্পনিক।
দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র
ধর্মীয় ইস্যুর আড়ালে দুর্নীতির চিত্র আরও ভয়াবহ। বাংলা এডিশনের হাতে আসা কলেজের বেতনের শিট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে বেরিয়ে আসে লুটপাটের আসল রূপ। বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক এবং কলেজের গভর্নিং বডির সদ্য সাবেক সভাপতি মো. আতাউল হক ভূঁইয়ার এক দাপ্তরিক চিঠিতেই উন্মোচিত হয় এই থলের বিড়াল।
মাউশির আঞ্চলিক পরিচালকের কাছে দেওয়া সেই গোপন চিঠির নথিতে, কোটি টাকার তহবিল তছরুপ, ভুয়া ভাউচার, জাল সনদধারী শিক্ষককে বহাল রাখা এবং জালিয়াতির মাধ্যমে ঘন ঘন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিবর্তনের সুস্পষ্ট প্রমাণ তুলে ধরা হয়।
অধ্যক্ষের এমন স্বেচ্ছাচারী একক আধিপত্যে অতিষ্ঠ হয়ে ফান্ড বন্ধ করে দেন সভাপতি আতাউল হক। আর এতেই তিনি উল্টো ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
জমি দখল ও অবৈধ বাণিজ্য
বাংলা এডিশনের হাতে আসা এক চুক্তিনামার নথিতে দেখা যায়, রেলওয়ের নিয়ম ভেঙে অধ্যক্ষ তার ঘনিষ্ঠ নার্গিস আক্তার মনি নামের এক বহিরাগত নারীকে কলেজ মাঠ ও ভবন বাদে বাকি ৬ একর জমি পুরোটাই বুঝিয়ে দিয়েছেন। ক্যাম্পাসের সেই জমিতে ঘর তুলে দিব্যি ভাড়াটিয়া বসিয়েছেন ওই নারী।
এমনকি গেটের বাইরে ১৫টি অবৈধ দোকান বসিয়ে নিয়মিত আদায় করা হচ্ছে অর্থ। এখানেই শেষ নয়, টেন্ডার ছাড়াই হয়েছে গেট নির্মাণ। ক্লাস বাদ দিয়ে কলেজের কক্ষ ভাড়া দেওয়া হচ্ছে বিয়ের অনুষ্ঠানে। আর এসব তথ্য সুকৌশলে গোপন করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো সাবেক সভাপতি সুশীল কুমার হালদার ও অধ্যক্ষের স্বাক্ষরিত একটি গোপন চিঠির নথিও পৌঁছেছে বাংলা এডিশনের হাতে।
আর এ বিষয়ে জানতে টিম বাংলা এডিশন সেই কথিত মনিকে খুঁজতে তার বাসায় গেলে ক্যামেরার উপস্থিতি টের পেয়ে সবাই লুকিয়ে যায়। ফলে তাকে আর পাওয়া যায়নি।
তথ্য ফাঁসের জেরে হেনস্তা
কলেজের এই অচলাবস্থা ও অনিয়মের তথ্য-প্রমাণ বাংলা এডিশনের কাছে তুলে ধরাই যেন কাল হলো শিক্ষক মিজানুর রহমানের। নারী শিক্ষিকাদের ভিডিও করার ভুয়া গুজব ছড়িয়ে খুলশী থানা থেকে পুলিশ ডেকে আনেন অধ্যক্ষ। কোনো ওয়ারেন্ট বা লিখিত অভিযোগ ছাড়াই এসআই জালাল আহমেদ জোরপূর্বক তল্লাশি চালান শিক্ষকের কক্ষে, জব্দ করেন মোবাইল ফোন।
তবে পুলিশ বলছে, তল্লাশিতে তার মোবাইল ফোনে আপত্তিকর কিছু পাওয়া যায়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে কিছু না পাওয়ার একটি লিখিত চিঠিও প্রমাণস্বরূপ এসেছে বাংলা এডিশনের হাতে।
পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ
অনুসন্ধানে জানা যায়, সিএমপির উত্তর এডিসি ট্রাফিক সোমেন মজুমদার অধ্যক্ষের আপন ভাই। অভিযোগ উঠেছে, ভাইয়ের পুলিশি ক্ষমতার এই দাপট দেখিয়েই প্রশাসনকে নিজের ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করেছেন তিনি।
তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা
অধ্যক্ষের এই সীমাহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষা বোর্ড, মাউশি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পৃথকভাবে তদন্তে নামলেও রহস্যজনক কারণে গত ছয় মাসেও আলোর মুখ দেখেনি কোনো প্রতিবেদন।
সকল অভিযোগ অস্বীকার করে পাহাড়তলী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ শ্যামল কান্তি মজুমদার বাংলা এডিশনকে বলেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে এইসব অভিযোগ আনা হয়েছে।
শিক্ষকের ওপর নৃশংস হামলা
এদিকে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখ খোলায় এবং বাংলা এডিশনের ক্যামেরায় বক্তব্য দেয়ায়, পুলিশি হেনস্তার পর শনিবার (২৯ আগস্ট) শিক্ষক মিজানুরকে রড দিয়ে পিটিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করা হয়।
ভুক্তভোগী শিক্ষকের অভিযোগ, কলেজ ক্যাম্পাস থেকে কয়েকজন যুবক তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরে কলেজের পাশে স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা ওয়াকিল হোসেন বগার অফিসে আটকে, দরজা বন্ধ করে লোহার রড দিয়ে পেটানো হয় তাকে। এসময় বগা ও তার সহযোগীরা প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবি করে। পুরো সময় জুড়ে স্বয়ং অধ্যক্ষকে ভিডিও কলে যুক্ত রাখেন বগা।
বর্তমানে ওই শিক্ষক চিকিৎসাধীন রয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এ ঘটনায় পুরো কলেজের শিক্ষকদের মাঝে বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক।
তদন্তের এই দীর্ঘসূত্রতার সুযোগেই পাহাড়তলী ডিগ্রি কলেজে এখনও একচ্ছত্র রাজত্ব চালাচ্ছেন অভিযুক্ত শ্যামল কান্তি মজুমদার। এখন দেখার বিষয়, ঐতিহ্যের এই কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকার আগেই টনক নড়ে কি না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
আরও পড়ুন:







