আশুলিয়ার পবনারটেক অন্তঃসত্ত্বা তরুণী মোছা. রোমানা আক্তার রুমি হত্যাকাণ্ডের প্রায় ছয় মাস পর মামলার এজাহারনামীয় প্রধান আসামি ও নিহতের স্বামী মো. বেলাল মিয়াকে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র্যাব-৪ ও র্যাব-১১-এর যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার বুড়িচং থানাধীন গোল্ডেন টাওয়ারের সামনে থেকে বেলাল মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। র্যাবের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি রোমানা হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন।
গ্রেপ্তার বেলাল মিয়া রংপুর জেলার পীরগাছা থানার দুধিয়াবাড়ী তালুক এলাকার মো. সালদার আলীর ছেলে।
মামলার এজাহার ও র্যাবের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে আশুলিয়ার পাবনারটেক এলাকায় ভাড়া বাসায় রোমানা আক্তার রুমিকে হত্যা করা হয়। রোমানা স্থানীয় একটি চুল তৈরির কারখানায় কাজ করতেন। ঘটনার সময় তিনি প্রায় দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।
প্রায় এক বছর আগে পারিবারিকভাবে বেলাল মিয়ার সঙ্গে রোমানার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তারা আশুলিয়ার পাবনারটেক এলাকায় একটি চুল কারখানার পেছনে হেলাল মাস্টারের বাড়ির ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ঘটনার দিন সকাল ৬টা থেকে ৮টার মধ্যে কোনো একসময় বেলাল পূর্বপরিকল্পিতভাবে রোমানার গলায় আঘাত করেন এবং পরে দুই হাতের কবজির রগ কেটে দেন। এতে ঘটনাস্থলেই রোমানার মৃত্যু হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়, হত্যাকাণ্ডের পর সকাল ৮টার দিকে বেলাল নিহতের ভাইয়ের কক্ষ থেকে একটি ভিভো স্মার্টফোন, তার মায়ের ব্যবহৃত একটি বাটন ফোন এবং নগদ ৫০০ টাকা নিয়ে বাসা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। চুরি যাওয়া মালামাল ও নগদ টাকাসহ মোট মূল্য প্রায় ১৮ হাজার ৭০০ টাকা বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বেলাল ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দরজা বন্ধ করার শব্দে রোমানার ভাইয়ের ঘুম ভেঙে যায়। তিনি দরজার কাছে গিয়ে বেলালের নাম ধরে ডাকাডাকি করলেও কোনো সাড়া পাননি। পরে তিনি দেখতে পান, বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগানো। পাশের ভাড়াটিয়ার সহায়তায় অতিরিক্ত চাবি দিয়ে দরজা খুলে বের হয়ে বেলালকে আশপাশে খোঁজ করেও পাওয়া যায়নি।
এরপর রোমানার মা ও ভাই তার কক্ষের সামনে গিয়ে ডাকাডাকি করেন। ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে তারা দেখতে পান, দরজায় বাইরে থেকে ছিটকিনি দেয়া। দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলে মেঝেতে রোমানার নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন তারা।
পরে স্থানীয়দের সহায়তায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর দেয়া হয়। খবর পেয়ে আশুলিয়া থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর ময়নাতদন্তের জন্য রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় নিহতের ভাই বাদী হয়ে বেলাল মিয়াকে প্রধান আসামি করে আশুলিয়া থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই বেলাল মিয়া আত্মগোপনে চলে যান। তাকে গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি র্যাবও ছায়াতদন্ত শুরু করে। দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস ধরে তার অবস্থান শনাক্তে গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান চালানো হয়।
একপর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র্যাব জানতে পারে, বেলাল কুমিল্লার বুড়িচং এলাকায় অবস্থান করছেন। এর ভিত্তিতে র্যাব-৪, সিপিসি-২, নবীনগর ক্যাম্প, সাভার ও র্যাব-১১, সিপিসি-২, কুমিল্লার একটি যৌথ আভিযানিক দল শনিবার সকালে বুড়িচং থানাধীন গোল্ডেন টাওয়ার এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। পরে গোল্ডেন টাওয়ারের সামনে থেকে বেলাল মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানটি র্যাব-৪, সিপিসি-২ এর ভারপ্রাপ্ত কোম্পানি কমান্ডার মো. হালিউজ্জামানের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়।
র্যাব-৪, সিপিসি-২ এর ভারপ্রাপ্ত কোম্পানি কমান্ডার মো. হালিউজ্জামান জানান, গ্রেপ্তার বেলাল মিয়াকে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি রোমানা আক্তার রুমি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ কী ছিল এবং কীভাবে পুরো ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে-এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গ্রেপ্তার আসামির বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এদিকে, প্রায় ছয় মাস পর মামলার প্রধান আসামি গ্রেপ্তার হওয়ায় হত্যাকাণ্ডের পেছনের প্রকৃত কারণ, ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না এবং হত্যার আগে-পরে বেলালের গতিবিধিসহ অন্যান্য বিষয় তদন্তে আরও পরিষ্কার হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আরও পড়ুন:







