বগুড়ার গাবতলীর বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভনের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রবিবার বাদ জোহর তাঁর দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের কর্মস্থল বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে অশ্রুসিক্ত বিদায় জানান সহকর্মী, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়রা।
এর আগে রাজধানী ঢাকায় চোখের চিকিৎসা করাতে গিয়ে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে নিহত রনজিলা পারভিনের মরদেহ রোববার সকালে তাঁর কর্মস্থলে পৌঁছালে পুরো বিদ্যালয়জুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া।
যে বিদ্যালয়ে জীবনের ৩৫ বছরেরও বেশি সময় শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় কাটিয়েছেন তিনি, সেই প্রিয় কর্মস্থলেই শেষবারের মতো ফিরলেন রনজিলা পারভিন। তবে এবার তিনি ফিরলেন লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে।
মরদেহ বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর পর কান্নায় ভেঙে পড়েন সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও স্বজনরা। শেষবারের মতো প্রিয় শিক্ষিকাকে দেখতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ভিড় করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। শোকের ভারে নীরব হয়ে পড়ে পুরো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার চেয়ারটিও পড়ে আছে শূন্য। যে চেয়ারে বসে প্রতিদিন বিদ্যালয়ের নানা দায়িত্ব সামলাতেন রনজিলা পারভিন, শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভাবতেন এবং সহকর্মীদের সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতেন, সেই চেয়ারটিই এখন যেন তাঁর অনুপস্থিতির নির্মম সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রিয় শিক্ষিকাকে শেষবারের মতো দেখতে আসা বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানিয়া খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ম্যাডাম আমাদের খুব ভালোবাসতেন। সব সময় পড়াশোনার খোঁজ নিতেন। আমরা কখনো ভাবিনি ম্যাডামকে এভাবে শেষবারের মতো দেখতে হবে। ম্যাডাম আর কোনো দিন আমাদের ক্লাসে আসবেন না এটা ভাবতেই খুব কষ্ট হচ্ছে।
আরেক শিক্ষার্থী রবিউল আলম বলেন, ম্যাডাম আমাদের নিজের সন্তানের মতো দেখতেন। কোনো ভুল করলে বুঝিয়ে দিতেন, ভালোভাবে পড়াশোনা করার পরামর্শ দিতেন। আজ ম্যাডামের মরদেহ দেখে বিশ্বাস করতে পারছি না তিনি আর আমাদের মাঝে নেই।
শনিবার ভোরে স্বামী মতিউর রহমানের সঙ্গে চোখের চিকিৎসার জন্য বগুড়া থেকে ঢাকায় যান রনজিলা পারভিন। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রাজধানীর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের সড়কে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে তিনি রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন। মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে।
ময়নাতদন্ত শেষে শনিবার মধ্যরাতে রনজিলা পারভিনের মরদেহ বগুড়া শহরের রহমাননগর এলাকায় পৌঁছায়। সেখান থেকে রবিবার সকালে মরদেহ নেয়া হয় তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
চিকিৎসা নিতে রাজধানীতে গিয়ে ছিনতাইকারীর হামলায় একজন শিক্ষকের এভাবে প্রাণহানির ঘটনায় ক্ষোভ ও শোক জানিয়েছেন স্থানীয়রা। দ্রুত ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
নিহত রনজিলা পারভিনের ভাই জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমার বোন চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় গিয়েছিল। কে জানত চিকিৎসা করাতে গিয়ে এভাবে লাশ হয়ে ফিরতে হবে। একজন নিরীহ নারী ও শিক্ষকের সঙ্গে এমন ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।
জানাজায় অংশ নেয়া শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারাও গভীর শোক প্রকাশ করেন। তারা বলেন, রনজিলা পারভিন ছিলেন একজন দায়িত্বশীল, স্নেহশীল ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছেন। তাঁর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু শিক্ষা পরিবারসহ পুরো এলাকায় শোকের সৃষ্টি করেছে।
তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
প্রথম জানাজা শেষে রনজিলা পারভিনের মরদেহ নেয়া হয় তাঁর গ্রামের বাড়ি গাবতলী উপজেলার তরফসরতাজ গ্রামে। সেখানে বাদ আছর দ্বিতীয় নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করার কথা রয়েছে।
আরও পড়ুন:







