রবিবার

৩০ আগস্ট, ২০২৬ ১৫ ভাদ্র, ১৪৩৩

সিলেটে তিনজনকে হত্যা নেপথ্যে কি শুধুই প্রেম?

সুমন আহমেদ সিলেট প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট, ২০২৬ ০৯:৫২

শেয়ার

সিলেটে তিনজনকে হত্যা নেপথ্যে কি শুধুই প্রেম?
ছবি বাংলা এডিশন

সিলেট মহানগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার নিকুঞ্জ ভিলায় একটি ছুরির আঘাতে তিনটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার ঘটনায় পুলিশ ব্যর্থ প্রেমের গল্প দেখালেও ঘটনার অন্তরালে ভিন্ন বাস্তবতার তথ্য পেয়েছে বাংলা এডিশন। নিহতের পরিবারের দাবি, হত্যার পরপরই ভূমি ও মামলা-সংক্রান্ত কাগজপত্র উধাও হয়ে গেছে। হত্যার পেছনের মাস্টারমাইন্ডকে আড়াল করতেই প্রেমের ধোঁয়াশাময় উপাখ্যান তৈরি করা হয়েছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

যেভাবে তিনজনকে হত্যা করা হয়

বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে সিলেট মহানগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার নিকুঞ্জ ভিলায় মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনাকে হত্যা করা হয়। এ সময় পুলিশ একে গৃহকর্মীর সঙ্গে হত্যাকারীর প্রেমের সম্পর্কের জেরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড বলে তুলে ধরে।

ঘটনার পর সন্দেহভাজন বাবুল মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, আব্দুস সাত্তারের গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে বাবুল মিয়ার প্রেমের সম্পর্কের জেরেই আব্দুস সাত্তারসহ তিনজনকে হত্যা করেন বাবুল মিয়া। এ বিষয়ে সিলেট মহানগরীর উপ-পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মোর্শেদ শামিম বাংলা এডিশনকে তথ্য জানান।

পরিবারের দাবি ও তদন্তে অবহেলার অভিযোগ

বাংলা এডিশনের অনুসন্ধানী দল সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে ভিন্ন তথ্য পায়। পরিবারের দাবি, দুই সপ্তাহ হয়ে যাওয়ার পরও পুলিশ হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি ঘাতক বাবুল মিয়ার স্টেটমেন্টের ওপর ভর করেই তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের পর বাসার আশপাশের লোকজনকে সেভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি বলেও দাবি পরিবারের। এ বিষয়ে নিহত আব্দুস সাত্তারের মেয়ে তারানা সুলতানা বাংলা এডিশনকে তথ্য জানান।

এত বড় একটি হত্যাকাণ্ডের পর আশপাশের মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ নিয়ে এমন অবহেলা টিম বাংলা এডিশনকে অনুসন্ধানের আরও গভীরে নিয়ে যায়। এরই মাঝে আরেকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায়। পরিবারের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের পর ভূমি ও মামলা-সংক্রান্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও কাগজপত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ একই জায়গায় টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান জিনিসও ছিল। সেসব অক্ষত থাকলেও উধাও হয়ে যায় মামলা ও জমির দলিল। অপরদিকে ড্রয়ারে থাকা অনেক কাগজপত্রের মধ্যে রক্তের চিহ্নও পাওয়া যায়। পরিবারের দাবি, এই কাগজপত্র ঘাতকই নিয়েছে।

জমি বিরোধ ও হুমকির প্রেক্ষাপট

প্রশ্ন জাগে, সেই ড্রয়ারে কি এমন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিল, যার কারণে ঝরে গেল তিন-তিনটি প্রাণ? জানা গেছে, ১৯৯৭ সাল থেকে রিকাবীবাজারের সরষপুর এলাকার প্রায় ১২ শতক জমি নিয়ে নিহত আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের বিরোধ চলে আসছে। এ নিয়ে আব্দুস সাত্তারকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য বিভিন্ন সময়ে হুমকিও দেওয়া হয়। বুধবার (২৯ জানুয়ারি) ২০২৫ তাঁদের বাসায় এসে আব্দুস সাত্তারকে হত্যার হুমকি দিতেও দেখা যায় একটি ভিডিওতে।

এমনকি এরই জেরে হত্যাকাণ্ডের বেশ কিছুদিন আগে আব্দুস সাত্তারের ওপর হামলা করে তাঁকে আহতও করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে গত বছরের রবিবার (৯ ফেব্রুয়ারি) আব্দুস সাত্তার একটি মামলা করেন বলে জানা যায়।

একদিকে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, আবার নিহতের ওপর বিভিন্ন সময়ে হামলা। অপরদিকে ড্রয়ার থেকে দলিলপত্র ও সেই হামলা মামলার কপিও উধাও। এসব বিষয় সামনে রাখলে অনেক কিছুই স্পষ্ট হতে থাকে। কিন্তু সেই স্পষ্টতার মধ্যেই যেন আরও ঘনীভূত হয় রহস্য।

পুলিশের তদন্ত ও আলামত নিয়ে প্রশ্ন

অপরদিকে পুলিশের তদন্তের ওপরও আঙুল তুলতে দেখা যায় পরিবার ও স্থানীয়দের। তাদের দাবি, পুলিশ দায়সারা কাজ করছে। যেভাবে তদন্ত করা দরকার, সেভাবে করছে না বলেও অভিযোগ তাদের। এমনকি হত্যাকাণ্ডের স্থান থেকে পুলিশের উদ্ধার করা ছুরি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা।

অন্যদিকে বাসার সিসিটিভি ফুটেজ নিয়েও রয়েছে নিহতের পরিবারের প্রশ্ন। বাসায় মোট তিনটি সিসিটিভি ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও মাত্র একটি ক্যামেরার ফুটেজের ওপর মামলার তদন্তকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির বাংলা এডিশনকে বলেন, তদন্ত জোরালোভাবে এগোচ্ছে। এবং যেই আলামত পাওয়া গেছে, সবকিছু ফরেনসিকে পাঠানো হয়েছে বলেও জানা যায় তাঁর কাছ থেকে।

প্রেমের ব্যাখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা

এছাড়া বাবুল আটকের পর পুলিশের দেওয়া বক্তব্য নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা ধোঁয়াশা। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ার জন্যই আসে বাবুল। আর এরই পরিপ্রেক্ষিতে ধারালো ছুরি দিয়ে হত্যা করে আব্দুস সাত্তারসহ অপর দুইজনকে।

তবে প্রশ্ন উঠছে, শারীরিক সম্পর্ক গড়ার জন্য প্রেমিকার কাছে এলে ধারালো ছুরির কী কাজ? আর বাড়ি ভরা মানুষের মাঝে কি শারীরিক সম্পর্কের জন্য সকাল সাড়ে ৯টা উপযুক্ত সময়? অনেকের এমন আরও নানা প্রশ্নে শুধু পুলিশের তদন্তের ওপরই আঙুল উঠছে না, প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও তদন্তব্যবস্থাও। বিশ্লেষকদের মতে, এ বিষয়ে পুলিশের দায়িত্বশীলতা যেমন জরুরি, তেমনই সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা হত্যার প্রকৃত মাস্টারমাইন্ডকেও দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।