শুক্রবার

২৮ আগস্ট, ২০২৬ ১৩ ভাদ্র, ১৪৩৩

নুসরাত হত্যা মামলা খালাসপ্রাপ্তদের সাত বছরের ক্ষতিপূরণ কী?

রহিম আলী জাবেদ ফেনী প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৮ আগস্ট, ২০২৬ ০৮:০৪

আপডেট: ২৮ আগস্ট, ২০২৬ ০৮:০৮

শেয়ার

নুসরাত হত্যা মামলা খালাসপ্রাপ্তদের সাত বছরের ক্ষতিপূরণ কী?
ছবি সংগৃহীত

ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির মধ্যে হাইকোর্ট ১০ জনকে খালাস দিয়েছে। চারজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে দেয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আর দুজনের মৃত্যুদণ্ড এখনো বহাল রাখা হয়েছে।

কিন্তু রায়ের পরই সামনে এসেছে এক জটিল প্রশ্ন, নুসরাত হত্যা মামলায় যারা খালাস পেলেন, তাদের জীবনের যে বছরগুলো কারাগারের চার দেয়ালের মাঝে ধ্বংস হলো, সেই সময় কি আর কখনো ফিরে আসবে? মামলার পেছনে অসহায় এই দরিদ্র মানুষগুলো যে অর্থ পানির মতো বিলিয়েছেন, সেই অর্থের দায়ভার নেবে কে?

খালাসপ্রাপ্তদের পরিবারের করুণ অবস্থা

অপরদিকে, নুসরাত হত্যা মামলায় সদ্য খালাস পাওয়া আসামিদের পরিবারের অবস্থাও করুণ। খালাস পাওয়া আসামিদের মধ্যে অন্যতম কামরুন নাহার মনি। জানা যায়, বিয়ের মাত্র ছয় মাসের মাথায় কারাগারে যেতে হয় তাকে। কারাগারে থাকাবস্থাতেই একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয় তার। পরিবারের দাবি, সাত বছর পর আদালত থেকে খালাস পেলেও আগের সংসার আর ফিরে পাননি তিনি। স্বামী-সংসার হারিয়ে এখন তার জীবন একেবারেই এলোমেলো।

কামরুন নাহারের মা।

এছাড়াও মনিকে আইনি সহায়তা দিতে গিয়ে তার ভাই মোস্তফা কামাল নয়ন চাকরি হারিয়েছেন বলে পরিবারের দাবি। মায়ের অভিযোগ, মেয়েকে মামলা থেকে রক্ষা করতে গিয়ে জমি পর্যন্ত বিক্রি করেছেন তারা।

এই মামলার আরেক আসামি রানাকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তার বাবা। এই ট্রমাতেই তার বাবা মৃত্যুবরণ করেন বলে দাবি ভুক্তভোগী পরিবারের। এ ছাড়া, বাবাকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগটিও রানাকে দেয়া হয়নি সেসময়ে।

ইফতেখার উদ্দিন, রানা’র মা। নামটা চেক করে নিয়েন।

এদিকে, খালাসপ্রাপ্ত আরেক আসামি শামীমের পরিবারের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাদের দাবি, শামীমকে মামলা থেকে বাঁচাতে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ পর্যন্ত দাবি করা হয়েছিল সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে। এছাড়াও কিছু অসাধু ব্যক্তি ও গণমাধ্যমকর্মীর অপতৎপরতায় নিরীহ মানুষকে মামলায় জড়ানো হয় বলেও তাদের অভিযোগ।

ভুক্তভোগী শামীমের মা।

একইভাবে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত উম্মে সুলতানা পপির পরিবারও তাকে নির্দোষ দাবি করছে। বিনা অপরাধে তাদের মেয়েকে সাজা দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

উম্মে সুলতানা পপির বাবা।

স্থানীয়রাও বলছে, নিরাপরাধ পপিকে এই মামলায় ফাঁসানো হয়েছে অন্যায়ভাবে।

অন্যদিকে, খালাসপ্রাপ্ত আসামিদের পরিবার, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের প্রতি।

মিডিয়া ট্রায়াল ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

অভিযোগ রয়েছে, ২০১৯ সালে ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলার ১৬ জন আসামির বিরুদ্ধে ব্যাপক মিডিয়া ট্রায়াল হয়। সে সময় ‘ফিফটিন মিনিটস’-এ অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের করা একটি প্রতিবেদন দেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। আর সেই প্রতিবেদনই যেন, সাত বছর পর মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নুসরাতের ঘটনা কোনো হত্যাকাণ্ড ছিল না; বরং তা ছিল একটি আত্মহত্যা। আর সেই আত্মহত্যার ঘটনাকে হত্যাকাণ্ডে রূপ দেয়ার অভিযোগ তোলা হয় তৎকালীন পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদারের বিরুদ্ধে।

এসবের পাশাপাশি, নুসরাতের ঘটনা, পরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার, এমন অভিযোগও সামনে আসে ‘ফিফটিন মিনিটস’-এর আলোচিত অনুসন্ধানে।

সবমিলিয়ে এই মামলায় নিরাপরাধ মানুষদের সাত বছর কারাবন্দী থাকা নিয়ে এখন চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। আদালতের একটি খালাসের রায় কি ফিরিয়ে দিতে পারে হারিয়ে যাওয়া সেই সময়? এটি এখন শুধু ভুক্তভোগী পরিবারের মনের আকুতি নয়, বিবেকেরও প্রশ্ন।



আরও পড়ুন: