একসময় গ্রামবাংলার পরিচয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল মাটির ঘর। গ্রীষ্মে শীতল, শীতে উষ্ণ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এসব ঘর ছিল আরামদায়ক ও পরিবেশবান্ধব। কিন্তু আধুনিক নির্মাণসামগ্রীর প্রসার, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কমে যাওয়ায় দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্য। তবুও সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও রায়গঞ্জের কয়েকটি গ্রামে এখনো টিকে আছে শত বছরের পুরোনো মাটির ঘর, যা বহন করছে বাংলার গ্রামীণ ইতিহাস ও সংস্কৃতির সাক্ষ্য।
গ্রামবাংলার একসময়কার চিরচেনা দৃশ্য ছিল মাটির ঘর। প্রায় প্রতিটি উঠানেই দেখা মিলত এমন ঘরের। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বদলেছে মানুষের জীবনধারা ও আবাসন ব্যবস্থা। ইট, বালু ও সিমেন্টের স্থাপনার ভিড়ে একের পর এক বিলীন হচ্ছে মাটির ঘর। তবে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও রায়গঞ্জের কিছু গ্রামে এখনো দেখা মেলে এই ঐতিহ্যবাহী নির্মাণশৈলীর, যা অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয় আজও।
স্থানীয় বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বাংলা এডিশনকে বলেন, মাটির ঘর শুধু বসবাসের স্থান নয়। এটি গ্রামীণ জীবনধারা, লোকজ স্থাপত্য ও পারিবারিক ঐতিহ্যেরও প্রতীক। এই ঘর নির্মিত হয়েছিল কয়েক প্রজন্ম আগে। নিয়মিত মাটি দিয়ে সংস্কার করে এখনো সেগুলো ব্যবহার করছেন অনেক পরিবার। পূর্বপুরুষের স্মৃতি ও ঐতিহ্য এখনো ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তারা।
প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে নির্মিত হওয়ায় মাটির ঘরের রয়েছে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য। প্রচণ্ড গরমেও ঘরের ভেতর তুলনামূলক শীতল থাকে, আবার শীতকালে থাকে উষ্ণ। এ কারণে অনেক বাসিন্দার মতে, বিদ্যুৎনির্ভর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই এসব ঘরে স্বস্তিদায়ক পরিবেশ পাওয়া যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ভুট্টো খাঁন বাংলা এডিশনকে বলেন, তবে দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা। উপযুক্ত মাটির সংকট, দক্ষ কারিগরের অভাব, ইঁদুরের উপদ্রব, রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় এবং নতুন প্রজন্মের অনীহার কারণে দ্রুত কমছে মাটির ঘরের সংখ্যা। ফলে অধিকাংশ মানুষ স্থায়ী ইট-কংক্রিটের ভবনের দিকে ঝুঁকছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মজিদ বাংলা এডিশনকে বলেন, তাড়াশ অঞ্চলে ধান চাষের আধিক্য থাকায় মাটির ঘরের ব্যবহার এখনো কৃষিজীবনের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব ঘরের মজবুত ছাদে দীর্ঘ সময় নিরাপদে ধান ও অন্যান্য কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করা যায়। ফলে কৃষিভিত্তিক জীবনধারায় এখনো মাটির ঘরের একটি বাস্তবিক গুরুত্ব রয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সরকারি মালিকানাধীন কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন পুরোনো স্থাপনা সংরক্ষণে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান বাংলা এডিশনকে বলেন, সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে গ্রামের চিত্র, বদলাচ্ছে মানুষের বসবাসের ধরনও। সেই পরিবর্তনের ধারায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী মাটির ঘর। অথচ এই ঘরগুলো শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং গ্রামীণ সংস্কৃতি, লোকজ স্থাপত্য এবং শত বছরের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ উদ্যোগ না নেওয়া হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মাটির ঘর কেবল ইতিহাসের বই, আলোকচিত্র কিংবা স্মৃতির অংশ হয়েই থেকে যেতে পারে।
আরও পড়ুন:








