গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক মানুষের চলাচলের সরকারি রেকর্ডভুক্ত রাস্তা দখলমুক্ত করতে প্রশাসনের দ্বারস্থ হওয়ার পর আহত জুলাই যোদ্ধা মো. রাশেদুজ্জামান আশিককে একের পর এক মামলা, হুমকি-ধামকি ও অপপ্রচারের মাধ্যমে হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে মো. জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় নিরাপত্তা ও প্রতিকার চেয়ে সুন্দরগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন আশিক।
ভুক্তভোগী আশিক উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত ধোপাডাঙ্গা গ্রামের মো. আয়নাল মিয়ার ছেলে। তিনি জুলাই গণ অভ্যুত্থানের আহত যোদ্ধা এবং উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সদস্য। অভিযুক্ত মো. জাহিদুল ইসলাম একই গ্রামের মৃত ফজলার রহমানের ছেলে।
লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডিসি সড়ক থেকে বিশ্বাস হলদিয়া যাওয়ার পথে কিশামত ধোপাডাঙ্গা হয়ে দাইম্মার বাতা অভিমুখী রাস্তাটি প্রায় ৯৫ মিটার দীর্ঘ। গড়ে ১৩ থেকে ১৪ ফুট প্রশস্ত এই রাস্তাটির সরকারি রেকর্ডভুক্ত জমির পরিমাণ প্রায় ১২ শতাংশ। স্থানীয়দের দাবি, ব্রিটিশ আমলের পুরোনো এই পথটি বর্তমানে প্রায় ৪০টি পরিবারের ৩০০ থেকে ৩৫০ মানুষের চলাচলের প্রধান ভরসা। রাস্তার দুই পাশে জাহিদুল ইসলামের পৈতৃক সম্পত্তি থাকায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর আগে ব্যবসায়িক কাজে গুদামঘর ও চাতাল নির্মাণের সময় রাস্তার একটি অংশ দখল করে নেওয়া হয়। পরে চলাচলের জন্য পাশে মাত্র পাঁচ ফুটের মতো সরু জায়গা রাখা হয়। ফলে প্রশস্ত সরকারি রাস্তা ধীরে ধীরে পরিণত হয় সরু এক চলাচলের পথে। এতে দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তা সংকুচিত হওয়ায় অ্যাম্বুলেন্সসহ বড় যানবাহন গ্রামে ঢুকতে পারত না। অসুস্থ রোগীকে কাঁধে করে মূল সড়কে নিতে হতো, এমনকি লাশবাহী যানবাহনও অনেক সময় বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারত না। বর্ষাকালে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যেত। দীর্ঘদিনেও সমাধান না হওয়ায় এলাকাবাসীর পক্ষে প্রশাসনের দ্বারস্থ হন আশিক।
আশিক জানান, ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর গণস্বাক্ষরসহ সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ইউএনও এবং ১০ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। পরে প্রশাসনের সার্ভে ও একাধিক নোটিশের পর ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে রাস্তার ওপর থাকা স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এতে দীর্ঘদিন পর চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হয় রাস্তাটি।
তবে রাস্তা উদ্ধারের পর থেকেই তাকে ও তার পরিবারকে মামলা, হুমকি ও অপপ্রচারের মাধ্যমে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ আশিকের। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, ৩০০ থেকে ৩৫০ মানুষের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করেই প্রশাসনের কাছে গিয়েছি। রাস্তা উদ্ধারের পর থেকেই একের পর এক মামলা ও অভিযোগের মুখে পড়ছি।’
অভিযোগ রয়েছে, রাস্তা দখলমুক্তের উদ্যোগ নেওয়ার পর জাহিদুল ইসলাম আশিক ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেন। একই সময়ে তাকে ‘ভুয়া জুলাই যোদ্ধা’ ও ‘আহত যোদ্ধা’ পরিচয়ে সরকারি ভাতা নেওয়ার অভিযোগও করা হয়। বিষয়টি আমলে নিয়ে অধিকতর তদন্ত করেন জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। প্রশাসনের তদন্তে এসব অভিযোগের কোন সত্যতা পাওয়া যায়নি।
আশিক আরও অভিযোগ করেন, আগের মামলাগুলোর একটির তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি এবং আরেকটি মামলা আদালতে খারিজ হয়েছে। এরপরও গত ১৪ জুলাই তার ও তার বাবার বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা করা হয়। এতে জাহিদুল ইসলামের স্ত্রীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হলেও তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মামলা-মোকদ্দমার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ও তার পরিবারকে নিয়ে অপপ্রচার এবং বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এতে তার পারিবারিক, সামাজিক ও একাডেমিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আশিক বলেন, ‘অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক, আর মিথ্যা হলে আমাকে ও আমার পরিবারকে হয়রানি থেকে রক্ষা করা হোক।’
এদিকে, জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্থানীয় আরও কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। মামলা-মোকদ্দমার কারণে এলাকায় তিনি ‘মামলাবাজ’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। তার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে কয়েকটি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে আইনি জটিলতার মধ্যে রয়েছে এবং এখনও কয়েকটি মামলা চলমান।
সুন্দরগঞ্জ থানায় দেওয়া অভিযোগে আশিক নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা, ধারাবাহিক মামলা-অভিযোগের কারণ তদন্ত এবং হুমকি-হয়রানির ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে মো. জাহিদুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ্ বলেন, ‘এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগটি যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে এবং কেউ আইন লঙ্ঘন করে থাকলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আরও পড়ুন:








