বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের পাহাড়ে জীবিকার সন্ধানে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছেন তিন বন্ধু। অংক্যমং তংচংগ্যা, চোপোচিং চাকমা ও চিংকং চাকমা নামের এই তিনজন স্থানীয় বাসিন্দা। ঈদুল আজহার মাত্র তিন দিন আগে পাহাড়ে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে তাদের মৃত্যু হয়।
সবুজে মোড়া শান্ত পাহাড়। হিমশীতল স্নিগ্ধ বাতাসের কোল ঘেঁষে প্রকৃতি সেখানে এঁকে চলে শান্তির ছবি। কিন্তু বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ে বসবাসকারী অসংখ্য মানুষের কাছে এই পাহাড় শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, জীবিকারও শেষ অবলম্বন। সেই জীবিকার পাহাড়ই এখন তাদের জন্য হয়ে উঠেছে অদৃশ্য মৃত্যুফাঁদ।
তিন বন্ধুর মর্মান্তিক মৃত্যু
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের পাহাড়ে থাকা কলাবাগান ও খেতখামারে প্রতিদিনের মতো জীবিকার সন্ধানে গিয়েছিলেন অংক্যমং তংচংগ্যা, চোপোচিং চাকমা ও চিংকং চাকমা।
সেখানে চিংকং চাকমার পায়ে একটি মাইন বিস্ফোরিত হয়। এতে মুহূর্তেই তার একটি পা উড়ে যায় এবং দুই হাত দগ্ধ হয়।
বন্ধুকে বাঁচাতে ছুটে যান অংক্যমং তংচংগ্যা ও চোপোচিং চাকমা। কিন্তু বন্ধুর আর্তনাদে ছুটে গিয়ে তারাও পা রাখেন মৃত্যুর ফাঁদে। পরপর আরও দুটি মাইনের বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তাদের শরীরের একেকটি অংশ। মুহূর্তেই নিভে যায় তিনটি প্রাণ।
উপার্জনক্ষম স্বামীকে হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পরিবার
একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামী চোপোচিং চাকমাকে হারিয়ে বাস্তবতার সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তের মুখোমুখি স্ত্রী দুক্কুমালা চাকমা। তিন সন্তানকে নিয়ে অভাব-অনটন আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে কাটছে তাদের দিন।
অংক্যমং তংচংগ্যার পরিবারেও একই বাস্তবতা। পরিবারের একমাত্র গৃহকর্তাকে হারিয়ে বড় ছেলেকেই এখন পরিবারের হাল ধরতে হচ্ছে। পড়ালেখা করে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার ইচ্ছা থাকলেও পরিবারের দায়িত্বে তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত অন্ধকারে ছেয়ে গেছে।
জানা যায়, তাদের ঘরের অবস্থাও নাজুক। ঝড়-বৃষ্টিতে ভেঙে পড়া ঘরের চাল চুইয়ে পানি পড়ে।
পাশেই চিংকং চাকমার পরিবার। সেখানে উঠে আসে আরও ভয়াবহ চিত্র। স্বামী হারানোর শোকে স্ত্রী মাখিনসিং মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। স্বামীর শোকে কাতর হয়ে তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে চাননি।
নিহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর দাবি
স্থানীয় বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক জসিম উদ্দিনের ভাষ্য, নিহত পরিবারগুলো চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। তাদের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।
পাহাড়ে কাজ করেই দুর্গম পাহাড়ের বাসিন্দাদের জীবন চলে। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, পাহাড়ে গেলেই আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা মাইনের ভয় মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক। শুধু জীবন নয়, এই আতঙ্ক মানুষের জীবিকা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও থমকে দিচ্ছে।
এলাকার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়দের অনেকে। তাদের অভিযোগ, মাইনের আতঙ্কে মানুষ পাহাড়ে যেতে পারছেন না, খেতখামারে কাজ করতে পারছেন না। জীবিকার তাগিদে পাহাড়ে যেতে হয়, অথচ সেই পাহাড়েই কখন পায়ের নিচে বিস্ফোরিত হবে মৃত্যুর ফাঁদ, সেই শঙ্কা নিয়েই দিন কাটছে সীমান্তের মানুষের।
নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে উদ্বেগ
বরইতলী বৌদ্ধ মন্দিরের ধর্মগুরু জ্যোতি স্মৃতি ভিক্ষুও সীমান্তের মানুষের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার অভিযোগ, মাইন বিস্ফোরণে মানুষের জীবন যেমন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে, তেমনি তাদের স্বাভাবিক জীবন ও জীবিকাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মাইন বিস্ফোরণে প্রাণ হারানো তিনজনের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবুজে মোড়া পাহাড়, প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা সেই জনপদ। অথচ সেই সৌন্দর্যের বুকেই এখন ছড়িয়ে আছে মৃত্যুর অদৃশ্য ছায়া। মাইন বিস্ফোরণে নিহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা জোরদার করাও এখন অপরিহার্য।
আরও পড়ুন:








