কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে স্কাউট দলনেতার মুখোশ পরে খোরশেদ আলম নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেইল ও অশালীন কুপ্রস্তাবের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। স্কাউটিং যা শেখায় শৃঙ্খলা আর নৈতিকতা। কিন্তু এই সংগঠনের আড়ালেই রচিত হচ্ছিল এক ভয়ংকর বিকৃতির অন্ধকার অধ্যায়।
প্রভাবশালী মহলের রক্তচক্ষুর ভয়ে এতদিন ভুক্তভোগীরা নিশ্চুপ থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটিমাত্র প্রতিবাদী পোস্টেই এখন বেরিয়ে আসছে একের পর এক রোমহর্ষক তথ্য।
অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ
অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযুক্ত খোরশেদ আলম মূলত সমকামী প্রবৃত্তির অধিকারী এবং কিশোর ও তরুণদের প্রতিই তার মূল আকর্ষণ। সুকৌশলে নানা অজুহাতে উঠতি বয়সী ছেলেদের নিজের বাসায় ডেকে নিতেন তিনি। এরপরই পাততেন যৌন হয়রানি আর লালসার ফাঁদ। ফেসবুকে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে স্থানীয় ও ভুক্তভোগীরা।
অনুসন্ধানে বাংলা এডিশনের হাতে এসেছে একটি ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপ। সেখানে খোরশেদ আলমকে স্পষ্টতই আপত্তিকর ইশারা করতে দেখা গেছে। এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য মেসেঞ্জার চ্যাটের স্ক্রিনশট, যেখানে তার বিকৃত মানসিকতার প্রমাণ মিলেছে। এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলেই ভুক্তভোগীদের জুটতো মিথ্যা মামলার হুমকি।
সম্প্রতি আতিকুল ইসলাম নামের এক যুবক তাকে সংশোধনের অনুরোধ জানালে উল্টো তার বিরুদ্ধেই অর্থ দাবির মিথ্যা অভিযোগ তোলার পাঁয়তারা করেন স্কাউটের ওই নেতা। এমন বিকৃত অপরাধ চালিয়ে যাওয়া খোরশেদ আলমের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি এখন সবার মুখে মুখে।
স্কুল শিক্ষার্থীরা টার্গেট
সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হলো, খোরশেদ আলমের লালসার মূল টার্গেট ছিল ভূরুঙ্গামারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। প্রতারণার জাল বুনতে স্কুলের আশপাশেই তাকে নিয়মিত ঘোরাফেরা করতে দেখা যেত বলে জানা যায়।
বিষয়টি নিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বাংলা এডিশনকে জানান, ঘটনাটি চরম গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন তিনি। নাসিমুল হক, প্রধান শিক্ষক, ভূরুঙ্গামারী পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়।
চাঞ্চল্যকর এসব অভিযোগের বিষয়ে খোরশেদ আলমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে বাংলা এডিশন। কিন্তু তার মুঠোফোন বন্ধ। এমনকি নিজ বাসায় খোঁজ নিয়েও মেলেনি কোনো সন্ধান। ঘটনার পর থেকেই লোকচক্ষুর আড়ালে আত্মগোপনে রয়েছেন অভিযুক্ত এই স্কাউট নেতা।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ
তবে গল্পের সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায়টি রচিত হয় খোদ আইনের রক্ষকদের হাত ধরে। ঘটনার প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগী আতিকুল ইসলাম ভূরুঙ্গামারী থানায় লিখিত অভিযোগ দিলেও অফিসার ইনচার্জ মো. আজিম উদ্দিন তা যেন আমলেই নেননি। অভিযোগ রয়েছে, উল্টো রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের উপস্থিতিতে তিনি সাফাই গেয়েছেন অভিযুক্তের পক্ষে। ওসি আজিম উদ্দিনের দাবি, খোরশেদ আলম ভালো ছেলে এবং তাকে ফাঁসানো হচ্ছে।
প্রমাণ না দেয়ার যে অজুহাত ওসি দেখিয়েছেন, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি অভিযোগকারী আতিকুল ইসলামের। তিনি জানান, থানা থেকে কখনোই তার সাথে কোনো যোগাযোগ বা তদন্তের উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
অন্যদিকে ভূরুঙ্গামারী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মুনতাসির মামুন মুন বাংলা এডিশনকে আশ্বস্ত করেছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হবে।
তদন্তের আগেই একজন অভিযুক্তকে ওসির এমন চারিত্রিক সনদপত্র দেয়ার বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। কুড়িগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিমতানুর রহমান বাংলা এডিশনকে স্পষ্ট জানিয়েছেন, দায়িত্বশীল পদে থেকে এ ধরনের মন্তব্য করার কোনো সুযোগ নেই আর এ বিষয়ে পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
শিক্ষাঙ্গন আর স্কাউটের মতো আস্থার জায়গাকে ব্যবহার করে এমন বিকৃত অপরাধ কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, ভূরুঙ্গামারীর এই ঘটনাই তার জ্বলন্ত প্রমাণ। ক্ষমতার দাপট আর স্থানীয় প্রশাসনের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তার দেয়াল ভেঙে ভুক্তভোগীরা কি আদৌ ন্যায়বিচার পাবেন? নাকি ভালো ছেলে তকমার আড়ালে হারিয়ে যাবে আরও শত তরুণের ভবিষ্যৎ, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষা।
আরও পড়ুন:








