বৃহস্পতিবার

২০ আগস্ট, ২০২৬ ৫ ভাদ্র, ১৪৩৩

বদলি খুলনায়, তবুও বায়েজিদ থানার চেয়ার ছাড়ছেন না ওসি করিম

বিবি মরিয়ম, স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২০ আগস্ট, ২০২৬ ১২:৫০

শেয়ার

বদলি খুলনায়, তবুও বায়েজিদ থানার চেয়ার ছাড়ছেন না ওসি করিম
ছবি: সংগৃহীত

প্রশাসনিক আদেশ জারি হয়, কিন্তু বদলায় না কেবল কর্মস্থলের চেয়ার। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে (সিএমপি) এখন এ যেন এক নিয়মিত দৃশ্য । প্রশাসনিক কারণে একের পর এক বদলির আদেশ জারি হলেও কর্মস্থল আঁকড়ে পড়ে থাকার নজির সৃষ্টি করেছেন একশ্রেণির কর্মকর্তারা।

এই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুল করিম। অন্যদিকে, বদলির নির্দেশ এড়াতে বা পছন্দের জায়গায় পদায়ন পেতে চলছে জোর তদবির।

গত ৬ আগস্টে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এডিশনাল আইজি এ কে এম আওলাদ হোসেনের স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে জানা যায়, সিএমপির পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. আবদুল করিমকে প্রশাসনিক কারণে খুলনা রেঞ্জে বদলি করা হয়। আদেশে ১০ আগস্টের মধ্যে ছাড়পত্র গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয় এবং ১১ আগস্ট থেকে তিনি তাৎক্ষণিক অবমুক্ত বলে গণ্য হন।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ ও বার্মা সাইফুলসহ বিভিন্ন অপরাধীদের সাথে যোগাযোগের অভিযোগে তাকে এ বদলি করা হলেও, নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও তিনি বায়েজিদ বোস্তামী থানার দায়িত্ব না ছেড়ে বহাল রয়েছেন এবং আদেশ বাতিলের চেষ্টা চালাচ্ছেন। আর তার এসব অপকর্মের সাক্ষী হিসেবে এএসআই জয়নাল আবেদীন, এএসআই রুবেল বড়ুয়া ও মোহাম্মদ ইউসুফ আলীর নাম এসেছে । এছাড়া ওসি করিমের সার্ভিস রেকর্ডে দেখা যায়, ইতিপূর্বে "ওয়ারেন্ট তামিল না করা", "সিডি ও বি প্রেরণে বিলম্ব" এবং "গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিলে অবহেলা"-র কারণে তাকে একাধিকবার সতর্ক ও তিরস্কারের শাস্তি পেতে হয়েছিল।

নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালের জুলাই মাসে দিনাজপুর পুলিশ লাইনসে কনস্টেবল পদে যোগদান করেন আবদুল করিম। এরপর ১৯৯৬ সালে এএসআই পদে সিএমপিতে যোগ দিয়ে দীর্ঘ সময় ঘুরেফিরে চট্টগ্রামেই দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১৬ সালে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর ২০২০ সালে বোয়ালখালী থানা এবং ২০২২ সালে সিএমপির ইপিজেড থানায় দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় সিটিএসবিতে কর্মরত থাকলেও পটপরিবর্তনের পর সিএমপিতেই বহাল থেকে কোতোয়ালী থানার ওসির দায়িত্ব নেন। এরপর ২০২৫ সালে পাঁচলাইশ এবং পরবর্তীতে বায়েজিদ বোস্তামী থানার অফিসার ইনচার্জের চেয়ারে বসেন তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে ওসি আবদুল করিম বলেন, "উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ‘প্রশাসনিক’ কারণে বদলি করেছেন। আমি আবেদন করেছি। সেটির উত্তর পাওয়ার পর চলে যাবো।" তবে সন্ত্রাসীদের সাথে যোগাযোগের কথা অস্বীকার করেন তিনি। অন্যদিকে, ওসি করিম বদলির বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রচার না করার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে প্রতিবেদকের কাছে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।

ওসি করিমের অপকর্মের অন্যতম সহযোগী এএসআই জয়নাল আবেদীন চট্টগ্রাম রেঞ্জে বদলির আদেশ পাওয়ার পর তা বাতিল করে নিজেকে সিএমপিতে রাখার জোর চেষ্টা চালান । পরবর্তীতে গত ২৬ জুন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খান স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে তার আগের বদলি বাতিল করে ‘ট্যুরিস্ট পুলিশ (চট্টগ্রাম অঞ্চল ব্যতীত)’-এ পদায়ন করা হয়। একইভাবে এএসআই রুবেল বড়ুয়া ও মোহাম্মদ ইউসুফ আলীকে সিএমপি থেকে বদলি করে তাদের যথাক্রমে শিল্পাঞ্চল পুলিশ ও এপিবিএনে পদায়ন করা হলেও শর্ত জুড়ে দেয়া হয় ‘চট্টগ্রাম অঞ্চল ব্যতীত’। তবে তারা ওসি করিমের বদলি না হওয়া পর্যন্ত কর্মস্থল ছাড়েননি।

এদিকে গত ৮ মে প্রজ্ঞাপনে প্রশাসনিক কারণে সিএমপি থেকে একাধিক এসআইকে একযোগে বদলি করা হয়। এদের মধ্যে এসআই কিশোর মজুমদার (শিল্পাঞ্চল পুলিশ), এসআই এ কে এম জালাল উদ্দিন (রেলওয়ে রেঞ্জ), এসআই মো. মনসুর হাল্লাজ ভূঁইয়া (শিল্পাঞ্চল পুলিশ), এসআই আবু কালাম (এপিবিএন), এসআই ইমাম হোসেন (এপিবিএন) এবং এসআই ফজলে রাব্বী কায়সার-কে (ট্যুরিস্ট পুলিশ) সিএমপি থেকে বদলি করা হয়। তাদের স্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয় ‘চট্টগ্রাম অঞ্চল ব্যতীত’ দায়িত্ব পালনের জন্য। তবে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাইরে বদলির নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও এসআই ইমাম হোসেন পরবর্তীতে কৌশলে পার্বত্য জেলা বান্দরবান এপিবিএনে বদলি বাগিয়ে নেন।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের প্রতিটি আদেশে স্পষ্ট উল্লেখ থাকে- নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে ছাড়পত্র গ্রহণ না করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ‘তাৎক্ষণিক অবমুক্ত’ বলে গণ্য হবেন। কিন্তু সেই প্রশাসনিক আদেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এতদিন কর্মস্থলে বহাল থাকা এবং তদবিরের মাধ্যমে আদেশ পরিবর্তন করানোর এই প্রবণতা সিএমপির প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।



banner close
banner close