একটি ঝুলন্ত মরদেহ। একটি বন্ধ দরজা। আর সেই দরজার ওপারেই যেন স্তব্ধ হয়ে আছে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের ঝুলন্ত নিথর দেহের শেষ গল্প। আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া রহস্যঘেরা মৃত্যুর এই গল্পের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য অমীমাংসিত প্রশ্ন এবং বিস্ময়কর কিছু বাস্তবতা।
দরজাটি বন্ধ থাকলেও রহস্যের দরজাটি এখনো যেন উন্মুক্ত রয়েছে কোনো এক অদৃশ্য আয়নায়। সেই বন্ধ দরজার তালা এবং দরজার ওপারে লুকিয়ে থাকা রহস্যের জট খুলতেই অনুসন্ধানে নামে বাংলা এডিশন টিম।
কিশোর মাহাদির পরিচয় ও মৃত্যুর ঘটনা
১৫ বছর বয়সী কিশোর আনজুম আহমদ মাহাদি। সিলেট ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্র। অন্য দশজন কিশোরের মতো তারও স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা করে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার। কিন্তু সেই স্বপ্ন থমকে দাঁড়িয়েছে অভিশপ্ত সেই বন্ধ দরজার ওপারেই।
গত জুন মাসে সিলেট নগরীর সুবিদবাজার এলাকার একটি বহুতল ভবনের চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয় স্কুলছাত্র মাহাদি আনজুমের মরদেহ। এই মৃত্যুটি প্রথমে আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করা হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই মৃত্যুকে ঘিরে বাংলা এডিশন টিমের চোখে পড়ে এমন কিছু বাস্তবতা, যা নিয়ে যায় অনুসন্ধানের আরও গভীরে।
বাবার মৃত্যু ও আগের রহস্য
রহস্যঘেরা, কুয়াশাচ্ছন্ন এই অজানা গল্পের সূত্রপাত হয় চার বছর আগে। ২০২২ সালে মাহাদির বাবা, ব্যবসায়ী মিসবাহ উদ্দিন, নিখোঁজ হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মৃত্যুর কিছুদিন আগে এক আত্মীয়ের কাছে নিজের প্রাণনাশের আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন তিনি। আর সেই আশঙ্কার কেন্দ্রে ছিল তার স্ত্রী—এমন তথ্য উঠে আসে তার একটি কল রেকর্ড থেকে।
অভিযোগ ছিল নির্মম নির্যাতনের। কিন্তু ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে সেই অভিযোগ রূপ নেয় হার্ট অ্যাটাকে। মাহাদির বাবার সেই মৃত্যুরহস্যের আজও সুরাহা হয়নি। এরই মধ্যে কিশোর মাহাদির কথিত আত্মহত্যার সাজানো গল্প সৃষ্টি করেছে আরও নতুন ধোঁয়াশার। মাহাদির মৃত্যু কি সত্যিই আত্মহত্যা ছিল? নাকি এটি ছিল সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড? এই ধোঁয়াশার উত্তর খুঁজতেই সরেজমিনে মাহাদির এলাকায় উপস্থিত হয় টিম বাংলা এডিশন।
সরেজমিন অনুসন্ধান ও সন্দেহের কেন্দ্র
সরেজমিনে মাহাদির বাড়িতে উপস্থিত হলে সামনে আসে এমন কিছু তথ্য-উপাত্ত, যার ভিত্তিতে সন্দেহের কালো মেঘ আরও ঘনীভূত হতে থাকে মাহাদির মা ডা. রুলি বিনতে রহিম এবং তার সৎ বাবা রেজভীর ওপর।
মাহাদির বাসার দারোয়ান সুমনের কাছ থেকে জানা যায়, মাহাদির মৃত্যুর দিন হঠাৎ মাহাদির সৎ বাবা তাকে ফোন করে জানান, বাসায় আগুন লেগেছে। দ্রুত বাসায় ফিরে আসতে বলেন তিনি। কিন্তু বিপত্তি বাধে ঠিক এখানেই। দারোয়ান ফিরে এসে দেখতে পান, বাসায় কোনো আগুন লাগেনি। বরং ফ্ল্যাটের দরজা খোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সুমন খান, মাহাদির ফ্ল্যাটের দারোয়ান। দারোয়ানকে দেয়া মাহাদির সৎ বাবা রেজভীর তথ্য আর বাস্তবতা যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ নয়; বরং দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা। আর সেই ভিন্ন বাস্তবতাই মাহাদির মৃত্যুকে এনে দাঁড় করিয়েছে বিবেকের কাঠগড়ায়।
অনুসন্ধানের সময় উঠে আসে এমন কিছু তথ্য, যা ইঙ্গিত করে মাহাদির মৃত্যু কোনো আত্মহত্যা নয়; বরং এটি একটি সূক্ষ্ম হত্যা পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। তথ্য-উপাত্তগুলো সামনে রাখলে মাহাদির মৃত্যুর ঘটনায় সন্দেহের তীর বারবার ঘুরে যায় তার সৎ বাবা রেজভীর দিকেই।
মৃত্যুর আগের বার্তা ও অভিযোগ
দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর, হাতে আসে মাহাদির মৃত্যুর আগে রেখে যাওয়া কিছু বার্তার স্ক্রিনশট। সেখানে অভিযোগ করা হয়, তার সৎ বাবা রেজভি তার আপন বোনকে ইঙ্গিতপূর্ণ খারাপ টাচ করেছেন। আর ঠিক এর কিছুদিন পরই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে মাহাদির কথিত আত্মহত্যার সংবাদ।
তাহলে কি সৎ বাবা রেজভীর লুকিয়ে থাকা পৈশাচিক চেহারা সম্পর্কে অবগত হয়ে পড়াটাই মাহাদির জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল? সেই প্রশ্নের উত্তর জানার আগে জানতে হবে মমতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মাহাদির ভাষায় তার মায়ের সেই ভয়াবহ রূপের কথা।
দাদার অভিযোগ ও পরিবারের আচরণ
মাহাদির দাদা আপ্তাব আলী বাংলা এডিশনকে বলেন, মাহাদিকে তার মা ডা. রুলি বিনতে রহিম এবং তার সৎ বাবা রেজভী হত্যা করেছে। তার দাবি, তারা ছাড়া অন্য কারও পক্ষে এই ঘটনা ঘটানো সম্ভব নয়।
আপ্তাব আলী, মৃত মাহাদির দাদা। অন্যদিকে, মৃত্যুর আগে মাহাদির রেখে যাওয়া বার্তার স্ক্রিনশট থেকেও মা ডা. রুলির আচরণ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেখানে মাহাদি তার মাকে সৎ বাবার চেয়েও অধিক নিকৃষ্ট বলে উল্লেখ করেছে।
মা ডা. রুলি বিনতে রহিমের বিরুদ্ধে দাদা আপ্তাব আলীর অভিযোগ এবং মাহাদির রেখে যাওয়া স্ক্রিনশট বাংলা এডিশনের অনুসন্ধানী দলকে আরও গভীরে নিয়ে যায়। ফলে, ডা. রুলির বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে মাহাদির এলাকায় আবারও সরেজমিনে যাওয়া হয়।
সেখানে এলাকাবাসীর কাছ থেকে উঠে আসে মাহাদির স্ক্রিনশটে উল্লেখ করা, বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গে মিল থাকা কিছু বক্তব্য। বেরিয়ে আসে মমতাময়ী মাতৃত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক ভিন্ন অবয়বের গল্প।
জীবন আহমদ হাওলাদার, মাহাদীর ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া। লল্লিক আহমদ চৌধুরী, পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি। মাহাদির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রুলি ও তাঁর কথিত স্বামীর সম্পৃক্ততার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে মাহাদির দাদা আপ্তাব আলীর অভিযোগে। তাঁর দাবি, মাহাদি মারা যাওয়ার পর তাঁকে দাদার বাড়িতে নিয়ে আসা হলেও শেষবারের মতো নাতিকে দেখতে আসেননি রুলি ও তাঁর স্বামী।
আপ্তাব আলী বাংলা এডিশনকে বলেন, যেখানে সন্তান মারা গেলে মা-বাবা কান্নায় ভেঙে পড়েন, শোকের ভারে দিশেহারা হয়ে পড়েন, কখনো কখনো নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উদ্ভ্রান্ত মানুষের মতো ছুটে বেড়ান, সেখানে মাহাদির মৃত্যুর ঘটনায় দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। চোখের জল তো দূরের কথা, নিজের সন্তানকে শেষবারের মতো দেখতেও আসেননি মা ও তাঁর কথিত স্বামী। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, কেন এমন আচরণ? কী এমন কারণ ছিল, যার কারণে একটি ১৫ বছর বয়সী সন্তানের মৃত্যুর পরও তাঁর মা শেষবারের মতো ছেলেকে দেখতে গেলেন না?
এ বিষয়ে একাধিকবার চেষ্টা করেও চিকিৎসক রুলি ও রেজভীর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এমনকি তাঁদের গ্রামের বাড়িতে গিয়েও পাওয়া যায়নি কাউকে।
পুলিশের বক্তব্য ও ময়নাতদন্ত প্রশ্ন
অন্যদিকে, মাহাদির আত্মহত্যার বিষয়ে সিলেট বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহিদুর রহমান বাংলা এডিশনকে জানান, মাহাদির মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।
শহিদুর রহমান, ওসি, সিলেট বিমানবন্দর থানা। জাকির শামীম, বাংলা এডিশন। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। প্রশ্ন উঠেছে মাহাদির বাবা মিসবাহ উদ্দিনের ময়নাতদন্ত নিয়েও। অভিযোগ রয়েছে, মাহাদির বাবার ময়নাতদন্ত তাঁর মা ডা. রুলির হাসপাতালেই সম্পন্ন হওয়ায় প্রকৃত তথ্য আড়াল হয়ে গেছে। সেই ঘটনার প্রকৃত রহস্য কখনোই সামনে আসেনি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, মাহাদির ময়নাতদন্তও একই হাসপাতালে সম্পন্ন হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এই ময়নাতদন্তের মাধ্যমে আদৌ কি প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হবে?
আরও পড়ুন:








