পিরোজপুরের জিয়ানগরে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে জমি দখল, মামলা ও হয়রানির অভিযোগ তুলে প্রতিকার চেয়েছিলেন প্রতিবন্ধী দিনমজুর মো. শহিদুল ইসলাম ও তার পরিবার। তাদের অভিযোগ, প্রতিবেশীদের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে রয়েছেন তারা। বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর এবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে প্রশাসন।
গত শুক্রবার (৭ আগস্ট) পিরোজপুরে ত্রাস সৃষ্টি করছে সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা স্বাক্ষী দেয়া হাসিনার দোসর শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে রবিবার (৯ আগস্ট) নির্যাতিত প্রতিবন্ধী শহিদুল ইসলামের বাড়িতে পরিদর্শনে যায় জেলা প্রশাসনের একটি প্রতিনিধি দল।
পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার পাড়েরহাট ইউনিয়নের হোগলাবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম। পেশায় দিনমজুর শহিদুল একসময় স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সংসার চালাতেন। তবে জমি নিয়ে বিরোধের পর থেকেই তার পরিবারে নেমে আসে নানা অনিশ্চয়তা।
পরিবারের দাবি, প্রতিবেশী মোস্তফা হাওলাদার ২০১০ সালে প্রয়াত জামায়াতে ইসলামী নেতা ও পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ছিলেন। পরে এসব প্রভাব খাটিয়ে ২০১১ সালে ওই জমির রেকর্ড সংশোধনের জন্য আদালতে মামলা করেন তিনি।
প্রশাসনের পরিদর্শন ও নির্দেশনা
প্রশাসন জানায়, প্রতিবন্ধী শহিদুলকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের বিষয়টি তাদের নজরে আসে। পরে পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক আবু সাইদের নির্দেশনায় জিয়ানগর উপজেলা সহকারী ভূমি কমিশনার মো. ওয়ালিউর রহমান রুবেলের নেতৃত্বে একটি প্রশাসনিক দল রবিবার (৯ আগস্ট) সকালে শহিদুলের বাড়িতে যায়। এ সময় উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়।
জিয়ানগর উপজেলা সহকারী ভূমি কমিশনার বাংলা এডিশনকে বলেন, সরেজমিনে তদন্তের সময় উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা হয়েছে। কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সর্বশেষ বিএস রেকর্ড এবং এর আগের এসএ রেকর্ড, দুই রেকর্ডেই প্রতিবন্ধী শহিদুল ইসলাম ও তার ওয়ারিশদের নাম রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জমি নিয়ে ১৭৫ বাই ২০১১ নম্বর দেওয়ানি মামলা চলমান রয়েছে। মামলার রায় না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত মালিকানা নির্ধারণের সুযোগ নেই। তবে রেকর্ড অনুযায়ী শহিদুল ইসলামের ভোগদখলে থাকার কথা। কেউ জোরপূর্বক তাকে উচ্ছেদ বা জমি দখলের চেষ্টা করলে আইনগত প্রতিকার নেয়ার সুযোগ রয়েছে। আদালতের রায় যার পক্ষে যাবে, পরবর্তীতে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ
ভুক্তভোগী শহিদুলের ভাগিনা হাফিজুর রহমান নয়ন বাংলা এডিশনকে বলেন, তার মামাদের জমি দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশীরা দখলে রেখেছে। এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর এসিল্যান্ড ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত জমি নিয়ে কোনো পক্ষকে জোরপূর্বক দখল না করার নির্দেশনা দেন। তবে তাদের দাবি এরপরও জমি দখলে রয়েছে। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেয়ার অভিযোগও করেন তিনি। এ অবস্থায় পরিবারের নিরাপত্তা ও জমি নিয়ে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ চায় তারা।
শহিদুলের স্ত্রী মঞ্জু বেগম বাংলা এডিশনকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, অভাবের সংসারে ঠিকমতো খাবার জোটে না তাদের। স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, চিকিৎসার খরচও জোগাড় করা কঠিন। তাদের দাবি, জমি তাদের ভোগদখলে থাকলে সেখান থেকে কিছু আয় করে সংসারের খরচ চালানো সম্ভব হতো।
অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য
অন্যদিকে অভিযুক্ত কুদ্দুস হাওলাদার বাংলা এডিশনকে বলেন, এসিল্যান্ড ঘটনাস্থলে এসে শহিদুলকে চলাচলের জায়গা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত তারা জমি দখলে রাখবেন বলে জানান। নিজের নামে রেকর্ড না থাকলে জমি দখলে রাখার আইনগত ভিত্তি কী, এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কিছুটা আশার আলো দেখলেও অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি প্রতিবন্ধী শহিদুল ইসলামের পরিবারের। দীর্ঘ ১৫ বছরের জমি বিরোধ, মামলা ও হয়রানির অভিযোগের দ্রুত অবসান চায় তারা। আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত রেকর্ডীয় জমিতে শান্তিপূর্ণ ভোগদখল এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি তাদের। এখন প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি আদালতের রায়ের দিকেই তাকিয়ে এই পরিবার।
আরও পড়ুন:








