চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে দেখা দিয়েছে বড় বৈপরীত্য। একই উপজেলা, একই শিক্ষা বোর্ড ও একই পরীক্ষায় কোথাও পাসের হার প্রায় ৮০ শতাংশ, আবার কোথাও ১০০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২০ জনও পাস করতে পারেনি। সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে রায়ছটা এলাকার বেদার বখ্ত চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয় (বিবি চৌধুরী স্কুল)। বিদ্যালয়টির ৬৭ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ফেল করেছে ৫৮ জন, পাস করেছে মাত্র ৯ জন।
এসএসসি পরীক্ষা-২০২৬-এর ফলাফলে বিদ্যালয়টির পাসের হার ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ, যা বাঁশখালীর ২৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে উপজেলার প্রথম স্থান অর্জনকারী বাঁশখালী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের (বঙ্গবন্ধু স্কুল) পাসের হার ৭৯ দশমিক ৭ শতাংশ। দুই বিদ্যালয়ের ফলাফলের ব্যবধান ৬৬ শতাংশ পয়েন্টের বেশি।
ফলাফলের এই বড় ব্যবধানের কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে বিবি চৌধুরী স্কুলে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক না থাকা, পরিচালনা কমিটি না থাকা এবং শিক্ষকসংখ্যার সংকট বিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নদ্বিতা রাণী দাশ জানান, ২০২৩ সাল থেকে বিদ্যালয়ে কোনো নিয়মিত প্রধান শিক্ষক নেই। ওই সময় থেকে তিনিই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ১০ জন। তাঁর দাবি, ২০২৪ সাল থেকে বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটিও নেই। সব মিলিয়ে আমাকে সহযোগিতা করার কেউ নেই। যার কারণে এ ফলাফল।'
শিক্ষাসচেতন মহলের মতে, একটি বিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা, শিক্ষক সমন্বয়, পাঠদানের তদারকি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রধান শিক্ষক ও পরিচালনা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘ সময় এসব কাঠামোগত ঘাটতি থাকলে তা শিক্ষা কার্যক্রম ও ফলাফলে কী প্রভাব ফেলেছে, তা বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
বাঁশখালীর ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুধু বিবি চৌধুরী স্কুল নয়, আরও কয়েকটি বিদ্যালয়ের ফলাফল তুলনামূলকভাবে দুর্বল। কামাল উদ্দিন চৌধুরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৪২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১০ জন; পাসের হার ২৩ দশমিক ৮১ শতাংশ। কাথারিয়া বাগমারা উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯১ জনের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৭৫ জন; পাসের হার ৩৯ দশমিক ২৭ শতাংশ। এম. আনোয়ারুল আজিম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাসের হার ৪০ শতাংশ। গন্ডামারা বড়ঘোনা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭৯ জনের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৩৪ জন; পাসের হার ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এ ছাড়া বৈলছড়ি নজমুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয় ও সরল আমিরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের পাসের হার যথাক্রমে ৪০ দশমিক ৩২ ও ৪০ দশমিক ২৭ শতাংশ।
বাঁশখালীর ফলাফলে সবচেয়ে উজ্জ্বল চিত্র বাঁশখালী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়টির ১২৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১০২ জন। পাসের হার ৭৯ দশমিক ৭ শতাংশ।উপজেলার ২৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ফলাফলের দিক থেকে বিদ্যালয়টি প্রথম হয়েছে।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নাটমুড়া পুকুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়–পাসের হার ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ। তৃতীয় রায়ছটা প্রেমাশিয়া উচ্চ বিদ্যালয়–৭১ দশমিক ৭৭ শতাংশ। চতুর্থ সাধনপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়–৬৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং পঞ্চম কালীপুর এজাহারুল হক উচ্চ বিদ্যালয়–৬৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
বাঁশখালী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার এয়ার মোহাম্মদ চৌধুরী বলেন, এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বিদ্যালয়ভেদে বড় ব্যবধানের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষক সংকট অন্যতম। তিনি বলেন, বর্তমানে উপজেলার ২৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ১৫টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। ফলে এসব বিদ্যালয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের পদটিও বর্তমানে শূন্য। লোহাগড়া উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার নুরুল ইসলাম অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে বাঁশখালীর দায়িত্ব পালন করছেন। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা, একাডেমিক সুপারভাইজারসহ মাত্র তিনজনের একটি টিম দিয়ে পুরো উপজেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো নিয়মিত ও কার্যকরভাবে তদারকি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিও শিক্ষার মান ও ফলাফলে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন তিনি।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, ৫৮ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার কারণ জানতে বিষয়ভিত্তিক ফলাফল, গত কয়েক বছরের ফলাফল এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা জরুরি। কোনো বিদ্যালয়ের খারাপ ফলকে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে শিক্ষকসংকট, পাঠদানের পরিবেশ, প্রশাসনিক নেতৃত্ব ও একাডেমিক তদারকিকেও মূল্যায়নের আওতায় আনা প্রয়োজন।
বিবি চৌধুরী স্কুলের এবারের ফলাফল তাই শুধু একটি বিদ্যালয়ের ব্যর্থতার পরিসংখ্যান নয়; একই উপজেলার বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ থেকে ৭৯ দশমিক ৭ শতাংশ পাসের হারের এই বড় বৈষম্যের পেছনের কারণ খুঁজে দেখারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
আরও পড়ুন:








