অভাবের সংসারে কৃষক বাবার সীমিত আয়ে পরিবারের খরচ চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই জোগাড় করে স্বপ্নের পথে এগিয়ে গেছে বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার দুর্জয় ঘরামি। ছোট শিশুদের পড়িয়ে টিউশনির টাকা এবং হাটে বড়ই বিক্রি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছে সে। কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের স্বীকৃতি হিসেবে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় এ প্লাস (A+) অর্জন করেছে দুর্জয়।
দুর্জয় ঘরামি কচুয়া উপজেলার মালিপাটন গ্রামের কৃষক রাজীব ঘরামির ছেলে এবং শহীদ আসাদ স্মৃতি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের আর্থিক সংকট দেখে বেড়ে ওঠা দুর্জয় বুঝতে পেরেছিল, নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে হলে তাকে নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করতে হবে। অর্থের সংকট থাকলেও পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ ও ভালো ফল করার প্রত্যয় কখনো কমেনি।
নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে এলাকার ছোট ছোট শিশুদের পড়াত দুর্জয়। টিউশনি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে বই-খাতা ও পড়াশোনার অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ চালিয়েছে। পাশাপাশি হাটে বড়ই বিক্রি করেও অর্থ উপার্জন করেছে সে। একদিকে নিজের পড়াশোনা, অন্যদিকে শিশুদের পড়ানোর দায়িত্ব সবকিছু সামলে এগিয়ে গেছে দুর্জয়।
অভাবের কারণে কখনো নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার আগে হিসাব করতে হয়েছে তাকে। পরিবারের সামর্থ্যের কথা চিন্তা করে নিজের চাহিদাও কমাতে হয়েছে। তবে এসব প্রতিকূলতা তার স্বপ্নকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে সে।
অবশেষে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দুর্জয়ের দীর্ঘ সংগ্রামের স্বীকৃতি মেলে। এ প্লাস (A+) অর্জন করে শুধু পরিবারকেই গর্বিত করেনি, এলাকার মানুষের কাছেও অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছে সে।
দুর্জয় ঘরামি বলেন, আমার পরিবারের এমন সামর্থ্য নেই যে তারা আমার পড়াশোনার সব খরচ বহন করবে। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি আমাকে নিজেই কাজ করে নিজের খরচ জোগাড় করতে হয়েছে। আমি টিউশনি করিয়েছি, আবার হাটে বড়ই বিক্রি করেও পড়াশোনার খরচ চালিয়েছি। অনেক কষ্ট ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে আমাকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছে। তবে কখনো হাল ছাড়িনি। আমার বিশ্বাস ছিল, যত কষ্টই হোক পড়াশোনা করে ভালো কিছু করতে হবে। ভবিষ্যতে আমি ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই। সরকার বা সমাজের বিত্তবানরা সহযোগিতা করলে আমার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সহজ হবে।
দুর্জয়ের বাবা-মা বলেন, আমাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। ছেলের পড়াশোনার সব খরচ আমরা দিতে পারিনি। নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই জোগাড় করতে সে টিউশনি করেছে, হাটে বড়ই বিক্রি করেছে। অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা চালিয়ে আজ সে ভালো ফলাফল করেছে। ছেলের এই সাফল্যে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। তার কষ্ট সার্থক হয়েছে এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।
দুর্জয়ের এক প্রতিবেশী বলেন, দুর্জয় ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত পরিশ্রমী ও মেধাবী। পরিবারের আর্থিক সংকট থাকলেও সে কখনো পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে যায়নি। নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে টিউশনি করেছে, হাটে বড়ই বিক্রি করেছে। অভাবের সঙ্গে লড়াই করে সে যে ভালো ফলাফল করেছে, এতে আমরা এলাকাবাসী অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। তার এই সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
শহীদ আসাদ স্মৃতি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পরিমল কুমার মণ্ডল বলেন, একেবারে দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে এমন ভালো ফলাফল করা সত্যিই অনেক কষ্টের বিষয়। দুর্জয়কে আমি সবসময় পরিশ্রম করতে দেখেছি। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সে পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী ছিল এবং নিজের চেষ্টায় এগিয়ে গেছে। আমার ছাত্র এমন ভালো ফলাফল করায় আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। তার এই সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
দুর্জয়ের পরিবার ও এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, আর্থিক সংকট যেন তার উচ্চশিক্ষার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন পূরণে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পেলে দুর্জয় আরও এগিয়ে যেতে পারবে বলে মনে করছেন তারা।
আরও পড়ুন:








